কাঁটা – সুশান্ত কুমার ঘোষ | ছোট গল্প | আমার সাহিত্য

0
28
বাংলা কবিতা | মেঘ-মৃন্ময় -সুশান্ত কুমার ঘোষ

কাঁটা


অবলা দুলে যখন দেহ রাখে , কার্তিক তখন তিন বছরের শিশু । নারানের বয়স ষোল । মাঝের তিন কন্যার একমাত্র জীবিত কমলা শ্বশুর বাড়িতে । কার্তিকের বাবা লক্ষ্মণ দুলে যখন মারা যায় , কার্তিক তখন মায়ের পেটে । বাবাকে সে দেখে নাই । ক্যামেরা বন্দী ছবিতেও না । নারান কিন্তু কার্তিককে বাবার অভাব বুঝতে দেয়নি কখনো । মা মারা যাওয়ার পর বাবা মায়ের যৌথ ভুমিকা নারানই পালন করেছিল । নারীশূন্য সংসারে ভাইকে মায়ের কোল দিতে সে বছরই ঘরে এনেছিল লক্ষ্মীকে । লক্ষ্মীও উঠোনের ছাদনাতলা থেকে দাওয়ায় উঠে কোলে তুলে নিয়েছিল কার্তিককে । বলাবাহুল্য বিয়ের পিড়ি থেকে উঠেই কোলে কার্তিক পেয়ে গর্ভে সন্তান ধারণের কথা ভুলেই গিয়েছিল লক্ষ্মী । ময়না তার কোলে এসেছিল বিয়ের দশ বছর পর । কার্তিক তখন রায়পুর উচ্চবিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির সেকেন্ড বয় ।

নারান ঘরের ছাগল ক’টার জন্যে মাঠের আল থেকে দুমুঠো ঘাসও কখনো ছিঁড়ে আনতে দেয়নি ভাইকে । কেবল বলত ‘ মা তোর কথা বলেই চোখ বুজেছে । বলেছিল কার্তিককে দেখিস । তুই ছাড়া ওর কেউ নাই । সেই তার শেষ কথা । সে কথা কি ফেলতে পারি ! তুই কেবল খাবি আর লেখাপড়া করবি । গায়ে গতরে আমরা খাটব । আমরা দু মানুষ থাকতে তুই ছিঁড়বি ঘাস!’

কার্তিক স্কুল পেরিয়ে কলেজে ঢুকল । ময়না গেল ইস্কুল । কিন্তু লক্ষ্মীকে কাজের ক্ষেত্র ছেড়ে ঢুকতে হল ঘরে । ময়না জন্মানোর পর থেকেই তার ডান পা-টা কেমন অবশ অবশ ঠেকছিল । ডাক্তার বদ্যি , ওঝা , গুনিন ,পীরতলা , মনসাতলা ঘুরে একসময় জন্মের মত ঘরে এসে ঢুকল । কার্তিক ততদিনে কলেজ পাশ করে প্রাইমারি স্কুলে মাস্টারিতে ঢুকে গিয়েছে । লক্ষ্মী ভেবেছিল নাই বা থাকল তার চলার পা ,খাটার গতর ; তার কার্তিক তো আছে ! সে বড় হয়েছে । চাকরি করছে । ভাতের অভাব তো ঘুচল । ভাত রাঁধার লোকের অভাব মেটালেই হল ! কার্তিকের বিয়ে দিয়ে বউ আনবে ঘরে । বেনারসির খুঁটেই বেঁধে দেবে সংসারের চাবি !

কার্তিকের বিয়ে হল । সংসারের চাবিও বাঁধা পরল নতুন বউয়ের শাড়ির খুঁটে । তবে সে তার একার সংসার । কার্তিক ততদিনে পেয়ে গিয়েছে অঞ্চল সভাপতি চেয়ার । হাঁড়ি আগেই ভেঙে গিয়েছিল , জায়গাটাও ভাগ হয়ে গেল । কার্তিক এখন দালান তুলছে । কালেভদ্রে স্কুলে যায় । পার্টির কাজেই দিন কাটে তার । কার্তিকের  নেতৃত্বে পুরো অঞ্চলটাই প্রায় কবজা করা গেছে । বাগ মানেনি দুলে পাড়াটা । তার দাদা নারান তাদের একজন । তাকে সামনে রেখেই দুলে পাড়া জোট বাঁধছে । পথে নামছে মিছিল । গ্রামে গ্রামে পোস্টার পড়ছে কার্তিকদের দলের বিরুদ্ধে ! এতে উপর মহল ক্ষুণ্ণ হচ্ছে । আস্থা হারাচ্ছে তার উপর । এভাবে অনাস্থার পাত্র হতে থাকলে সে অঞ্চল থেকে রাজ্যে যাবে কেমন করে ! তার দাদাই সে পথে বিচোচ্ছে কাঁটা ।সহোদর ভাই ! তারই কিনা এমন শত্রুতা ! ঘরশত্রু বিভীষণ আর কাকে বলে !কার্তিকের যত রিস তাই নারানের উপর। ভীষ্মের ন্যায় চেতন মৃত্যুর শরজালে তাকে বন্দী করার নেশায় উন্মাদ হয়ে উঠল কার্তিক !

নিঃস্ব নারান এখন একশ দিনের কাজ পায়না । বি পি এল এর সুবিধা পায়না । ভোটের লাইনে দাঁড়াতে পারেনা । ভোটার আই কার্ড থেকে জব কার্ড – সবই রাখা ছিল  ভাইয়ের জিম্মায় । সেই চোখের মনি ভাইয়ের চোখেই নারান এখন কাঁটা ! কার্তিকদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে গ্রামের কেউ কাজও দিতে সাহস পায়না নারানদের । কাজের খোঁজে ওরা বাইরে যায় । পাঁচ মাইল দশ মাইল দূরের ক্ষেত খামার ইট ভাঁটায় কাজ করে । তারার আলোয় ঘর ছেড়ে , তারার আলোতেই ঘরে ফেরে ।

নারান সেদিনও ভোর ভোর বেরিয়েছিল কাজে । দুমাইল সাইকেল টেনে , ট্রেনে চড়ে তিনটে স্টেশনের পর বেড়ালি স্টেশন । স্টেশনে নামলেই জমির মালিকেরা ডেকে নেয় কাজে । কার্তিকও বেরিয়ে গিয়েছিল সকালে । তার এখন অনেক কাজ । একটু বেলার দিকে জায়ে জায়ে শুরু হয় ঝগড়া । উপলক্ষ্য পুঁইলতা ! কার্তিকের পুঁইলতা বেড়া টপকে এদিকে আসায় নারানের পরিবার নাকি ছিঁড়ে নিয়েছে ! নামমাত্র বেড়া । বড় বাড়ির কারোর মুখ না দেখার পণ করেছিল কার্তিকের স্ত্রী । সেই ইচ্ছের মর্যাদা দিতে বছর তিনেক আগে বাঁশের খুঁটি পুঁতে তালপাতার বেরা দিয়েছিল কার্তিক । তিন বছরের জল- বাতাস আর উইয়ের দাপটে বেড়ার আর কিছু অবশিষ্ট ছিলনা । দু’চারটে পলকা খুঁটি আর দু’চারটে উইয়ের উচ্ছিষ্ট তালপাতার বাগরা টিমটিম করছিল । দালানের কাজ শেষ হলে পাকা পাঁচিল তোলার ভাবনা মাথায় থাকায় , ওদিকটায় নজরও দেয়নি কার্তিক । সেই টিমটিমে বেড়ার উপরেই বর্ষায় লকলকিয়ে উঠেছিল পুঁই । শীতে লতা ভর্তি মেটুরি ধরেছে । তারই একটি লতা নাকি চুরি করেছে বড়র বাড়ি । ছোটবঊ গাল পাড়ে। বড়বউ তার ভগ্নাংশের জবাব দেয় । তবে পরের ধনে যে তার লোভ নাই , একথা সে বারবার বলতে থাকে ।

রাতের অন্ধকারে ময়নাই ছিঁড়েছিল পুঁইলতাটা । লক্ষ্মী প্রায় শয্যাশায়ী । পেটে দু’মুঠো খাওয়া আর মুখে দুটো কথা বলা ছাড়া আর কিছুই সে পারেনা । ঘরগৃহস্থালির সব দায় এখন ময়নার । ভোর ভোর ঊঠে , ঘর-গৃহস্থালির সব কাজ সেরে স্কুল যায় । রায়পুর হাইস্কুলে ক্লাস সেভেনে পড়ে সে ।সব দিন স্কুল যাওয়া হয়না । তবে সময় পেলে হাতছাড়া করেনা ।

বাবা কাজে বেরোয় ভোর পাঁচটায় । সারাদিনের মামলা । ময়নাই মাঝরাতে উঠে দুটো ফুটিয়ে দেয় তাকে । সেদিন ভাতের সঙ্গে দেবার মত কিছুই ছিলনা ঘরে । ময়না ছিঁড়ে এনেছিল পুঁইলতাটা ।বাবা টের পেলে নিষেধই করত ময়নাকে । বাবা তখন জাগেনি । মায়ের কাছে রাত বলে আলাদা কিছু নাই । সব সময় তো বিছানায় । কান দুটো তার সজাগ । পুঁইলতা ছেঁড়ার আওয়াজটা শুনতে পেয়েছিল মা । সঙ্গে সঙ্গে বিছানা থেকেই বলেছিল ‘ দেখতো মা , কিসের শব্দ হল !’ ময়না পা টিপে টিপে উঠোন থেকে চলে এসেছিল রান্নার চালায় । পরে বলেছিল ‘ ওকিছু নয় , কুকুর বেড়াল হবে হয়তো!’

ঝগড়া যখন শুরু হয় , ময়না ছিলনা ঘরে । লক্ষ্মীও তখন পর্যন্ত ভাত খায়নি । খেলে হয়তো পরের ধনে নির্লোভতার কথা সে অন্তত বলতো না । দুপুরে কার্তিক ফিরল ঘরে । বউ তার পেট ভরানোর ব্যবস্থাটা আগে না করে , কান দুটো ভরিয়ে তুলল সাতকাহন কেচ্ছায় । নারানের ফিরতে রাত হয় । একে শীতের রাত , তার উপর সারাদিনের খাটনি । এই সময় পাড়ার প্রায় প্রত্যকেই খেয়ে দেয়ে শুয়ে পড়ে । দুপুরের পর কার্তিক আর বেরোয়নি । বউ তাকে পাখি পড়ানো করে শিখিয়েছে হেস্তোনেস্তোর বুলি ।

ওপারে নারানের গলার আওয়াজ পেতেই এপার থেকে গর্জে উঠল কার্তিক । ঢোলের তালে কাঁসির সঙ্গত দেওয়ার মত ঝনঝন করে উঠল তার বউ । নারান কিছু না বুঝেই নেমে এলো উঠোনে । নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়ে থেকে বোঝার চেষ্টা করছিল ব্যাপারটা কি । ময়না দাওয়ার খুঁটি ধরে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিল । কার্তিক ততক্ষণে বেড়া টপকে চলে এসেছে এপারে । কন্ঠে তার পাহাড় টলানো চিৎকার । দাদার নীরবতাকে বিদ্রুপ ভেবে কার্তিক আরো ক্ষেপে উঠল । বেড়ার পাশেই পরেছিল একটা রডের টুকরো । দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য কার্তিক সেই রডটা চালিয়ে দিল দাদার পেটে । তীক্ষ্ণ একটা আর্তরব ঝলসে উঠেই থেমে গেল ! পল কয়েকের বিহ্বললতা ! তারপরেই দুই ভাই ছিটকে গেল দু’দিকে । ছোটো ভাই কার্তিক বেড়া টপকে হারিয়ে গেল অন্ধকারে ! বড় ভাই নারান দুলে লুটিয়ে পড়ল মাটিতে !


সুশান্ত কুমার ঘোষ , পূর্বাশা পল্লী , পোষ্ট ঃ গুসকরা , জেলাঃ পূর্ব বর্ধমান – ৭১৩১২৮ । পশ্চিমবঙ্গ , ভারত ।

ফেসবুকে মতামত
 

মতামত দিন

দয়া করে আপনার মতামত দিন
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন