ছোট গল্প | অজয়- সুশান্ত কুমার ঘোষ

0
43
বাংলা কবিতা | মেঘ-মৃন্ময় -সুশান্ত কুমার ঘোষ

অজয়

 সুশান্ত কুমার ঘোষ


নৌকাটা হঠাৎ দুলে উঠল । নেশার আবেশে একটু তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিল বঙ্কু । নৌকার দুলুনিতে তন্দ্রার ঘোরটা কেটে গেল । ছইয়ের ভিতরে বসে তীরের দিকে একবার দেখল । না, কোথাও কিছু নেই । ছইয়ের ছায়া তেরচা হয়ে গলুই ছাড়িয়ে তীরে গিয়ে পড়েছে । ছায়াটা কেমন কাঁপছে যেন । নৌকা দোলার তালে ছায়াটাও কেঁপে কেঁপে উঠছে । আছড়ে পরা স্রোতের আঘাতেই হয়তো দুলে উঠল নৌকা । নয়তো এত রাতে ভরা নদীর মগ্ন চরে কে আসবে , কেনই বা আসবে – মনে হল বঙ্কুর । তার আপনার জন বলতে তিন কুলে কেউ নাই । তাই বাউণ্ডুলের মত পরে আছে নদী কুলে । তাও মাত্র দুটো মাস । এ তো আর গঙ্গা নয় যে স্বর্গ থেকে নিয়ে আসবে চিরকেলে যৌবন । এ হল অজয় ! এ নদী কৃপণ অতি । মাস পেরলেই বুড়িয়ে যাবে । দু’পাশে ছড়িয়ে থাকবে নীরস দেহের মরা বালি । জরতী বুড়ির দশা দেখে তখন কে বলবে এই শরীরের এত তেজ । উথাল পাথাল তুফান তুলে নাগর নাচায় চরে চরে । রাগ মোচনের তীব্রতায় হামলে পরে তীরে , ভেঙ্গে ফেলে বাঁধ । মোচন রসের তপ্ত ধারায় ভেসে যায় গ্রামের পর গ্রাম । রাত পেরলেই ঠাণ্ডা সব । ছুড়ি তখন বুড়ি যেন । সেই বুড়ি নদীর মরা চরে নায়ের মাঝি বঙ্কু বিহারী বাউল সেজে কোথায় যেন হারিয়ে যায় । খোয়াই ভাঙ্গা পথে পথে , মহুল বনের কোণে কোণে খুঁজে ফেরে সাথিকে । রুক্ষ রাঢ়ের ফুটিফাটা প্রান্তরে , রোদ পাহাড়ের অগ্নিরিরি কন্দরে হাপিত্যেশ খোঁজার পর হঠাৎ একদিন নেমে আসে বর্ষা । পথের বাউল পথে ফেলে নায়ের মাঝি নায়ে ফেরে । অজয় হাসে খিলখিলিয়ে । বঙ্কু ধরে ভাটিয়ালি ।

বঙ্কু গাইলে না নেচে কি পারে ! বেউল বাঁশির সুরে তার মরা খাতেই জোয়ার আসত । ছুড়ির রগর দেখে বুড়িরও যে যৌবন উঠত জেগে । ছুড়ি একদিন পালিয়ে গেল । পাগলটাকে বুকে চেপে বাঁচিয়ে রাখল বুড়ি । সতীন একদিন এল এতদিনের নাগরটাকে ছিনিয়ে নিতে । বুড়ির আর প্রাণে সইল না । বেহুঁশ নদী হারিয়ে ফেলল জ্ঞান । সতীনটাকে গিলতে গিয়ে সতীন অঙ্গে লেপটে থাকা নাগরটাকেও গিলে ফেলল ।

নদীর আর দোষ কি । চরে যদি রাই নাচে রাখালিয়ার মোহন সুরে , সে কি আর না মজে থাকতে পারে । বঙ্কুর তখন কত আর বয়স , চোদ্দ বৈ তো নয় । রাইয়ের সবে দশ । গোষ্ঠের গোরু বাথানে বেঁধে বঙ্কু ছুটত ঘাটে। রাই ছুড়ত বালি , বঙ্কু ছিটাতো জল । তিত্তিরে নদী কুলকুল করে বয়ে যেত । সঙ্গে যেত মাছ। দু’জনে দু’প্রান্তে ধরত গামছা । রাই হাঁটত তীরে তীরে , বঙ্কু হাঁটত জলে । গামছার আঁচলে ছেঁকে তুলত মাছ । কুচো মাছের পোটলা বেঁধে রাই আসত ছুটে । বলত ‘ মা বঙ্কু ধরেছে । ভেজে দাও ।‘ দু’জনে খেতে বসত ভাত । রাই বসত দাওয়ার উপর । বঙ্কু বসত দাওয়ার পাশে কাঁঠাল গাছের নিচে । উপু হয়ে বসে টাটকা মাছের চচ্চড়ি দিয়ে খেয়ে ফেলত বড় একবাটি ভাত । রাই খেতে খেতেই হাঁক পারত ‘ বঙ্কু , আর ভাত নিবি ?’ বঙ্কু মাথা নাড়ত । রাইয়ের মা খেয়াল করতেন না । থালা ভর্তি ভাত নিয়ে কাছে গিয়ে বলতেন ‘ বঙ্কু , আর দুটো ভাত দিই?’বঙ্কু মুখের বড় গ্রাস আধ গেলা করে বলত ‘ না, আর লুবো না ’ ‘ তাহলে মাছের চচ্চড়ি দিই একটু?’ মুখের গ্রাস সম্পূর্ণ গিলে বলত –না । বঙ্কুর খাওয়া শেষ হত । রাইয়ের থালা তখনো ভর্তি । বঙ্কুর বড় বড় গ্রাসে খাওয়া সে অবাক হয়ে দেখত । মাকে ফিসফিস করে বলত ‘ মা , বঙ্কু কেমন খায় দেখো । অনেক খেতে পারে , না ?’ মা বলতেন ‘ কত পরিশ্রম করে বল তো । না খেলে হবে ।‘

চোদ্দ বছরের বঙ্কু একলা হাতেই সামলে দেয় গৃহস্থের দশ দিক । ঘরের কাজ , মাঠের কাজ সব দিকেই সে সিদ্ধহস্ত । দশ বারোটা গোরু দেখভালের পর মাঠের ধান , শাকসবজির পরিচর্যা , রোপণ বপন ,তুলে আনা – সব কাজই সে করত হাসি মুখে  , আনন্দের সঙ্গে । কাজ পাগল বঙ্কুর কাজ না থাকলেই বরং মন খারাপ হত । অবসর সময়ে বাবার সঙ্গে হাত লাগাত বাঁশ বেতের কাজে । বর্ষার সময় মাঝে মাঝে বাবাকে নায়ে বসিয়ে বঙ্কু টানত দাঁড় । চোদ্দ বছর বয়েসেই সে হয়ে উঠেছিল পাকা নেয়ে ।

গ্রীষ্মের দিনে নদীর চরে শাকসবজির মেলা ।  বিকেলে ঝুড়ি কাস্তে মাথায় তুলে বঙ্কু যেত ক্ষেতে । পিছনে যেত রাই , মাঝারি একটা পেছে হাতে । ক্ষেতে গিয়ে ডাঁই করত ঢ্যাঁড়শ , শসা , কাঁকুড় , ঝিঙে ,উচ্ছে , পুঁইশাক ,বিম । হাটুরে মেয়েরা আসত দাঁড়ি পাল্লা আর পাঁজা নিয়ে । মেপে নিত সবজি । সবজির পাট শেষ হলে দুজনে জমির চারপাশে পেকে ওঠা বিউলি ডালের শুঁটি তুলত । কলাই ঢ্যাঁড়শের সুঙে রাইয়ের কচি হাত উঠত গুল গুলিয়ে । বঙ্কু চুলকে দিত । চুলকানি মাত্র ছাড়ালে চুষে দিত আঙ্গুল ।

শীতের চরে নদী পরত হলিদ শাড়ি । হলুদ গায়ে সবুজ-সাদার বুটিক । বঙ্কু আসত কাস্তে হাতে কপি কাটতে । সঙ্গে যেত রাই ।হাতের টানে উপড়ে ফেলত মুলো । ছিঁড়ে আনত পালং । হাটুরেরা চলে গেলে রাই তুলত মটরশুঁটি । বঙ্কু তখন রাই কিশোরীর এলো খোঁপায় গুঁজে দিত সরষে ফুল । রাই তাকাত পিছন পানে , হাসি মুখে । বঙ্কুর চোখে চোখ পরলে নামিয়ে নিত মুখ । হরিণ পায়ে ছুটে যেত আলের ধারে ।

বাড়ি ফিরে বঙ্কু মনিব গিন্নিকে শাক সবজির হিসাব বুঝিয়ে দিত । হাটুরেরা হাট থেকে ফেরার পর ক্ষেত থেকে বিকেলে নিত সবজি । মিটিয়ে যেত  আগের দিনের সবজির দাম ।  মনিব গিন্নি বঙ্কুর হাতে তুলে দিতেন চার আনা । তাই পেয়ে বঙ্কু ছুটত দোকানে । পিছনে ছুটত রাই । দোকানে কিনত চাটনি , লজেন্স । ভাগ করে খেত দু’জনে । কোনো কোনো দিন রাইকে একটা চাটনি দিয়ে নিজে কিনত কাঁচের মারবেল , ভাটা । মারবেল খেলায় বঙ্কু ছিল ওস্তাদ । প্রতিদিন জিতে আনত কাঁড়ি কাঁড়ি মারবেল । সে সবের দখল নিত রাই । জমিয়ে রাখত কলসিতে । বঙ্কুকে দিত না । খেলার জন্য বঙ্কুকে তাই কিনতে হত নতুন মারবেল ।

শীতের শেষে বসন্ত আসত চরে । ভাঙা ঢেউয়ের বর্ণচ্ছটায় নদী উঠত ঝলমলিয়ে । ব্যাপ্ত চরে চিকচিক করত বালি । গাছে গাছে শিমুল ফুলের রক্তিমতায় আকাশ উঠত রেঙ্গে । সেজে উঠত পলাশ । বৃন্তচ্যুত পলাশ হাসত রাই কিশোরীর খোঁপায় ।  সেই ছেঁড়া পলাশের রাঙা আবেশেই রাই কিশোরী একদিন করে বসল ভুল ।গাছ থেকে  ঝরে পরা একটা উড়ন্ত পলাশ ধরতে গিয়ে ভগ্ন চরায় পা হোড়কে হুমড়ি খেয়ে পরল এসে বঙ্কুর গায়ে । বঙ্কু তার পতন রুখতে জড়িয়ে নিল বুকে । নদীর ঘাটে জল নিতে আসা দু’একজন রসিক বউ বাঁকা চাউনির নজর বানে দেখল তাদের চেয়ে । ঘরে ফিরে রাইয়ের মায়ের কান তুলল ভারি করে । কানে কানে ফিসফিসিয়ে বলল ‘ দিদি গো , পলাশ বনে দেখে এলাম বঙ্কু-রাইয়ের কুঞ্জলীলা ।’মা উঠলেন চমকে । সর্বনাশ !রাধা তো এই বারই ছিল । কেষ্ট ছোঁড়া গোষ্ঠপতি !

নিজের উপর খুব রাগ হল নদীর । এ কি বে-আক্কেলে কাজ তার ! ছোটো গর্ত  খোঁড়ে কেউ ! এর থেকে যদি নামিয়ে দিত ধ্বস ! খাদের ভিতরে বঙ্কু-রাইকে কে দেখত চোখ মেলে ! এবার ভাঙবে ! এবার বর্ষায় তছনছ করে দেবে সব ! বানিয়ে দেবে গুহার পর গুহা । খেলবে ওরা । দেখি কার সাধ্য চেয়ে দেখে ।

নদীর সব ভাবনাই বিফলে গেল । পরদিনই গোষ্ঠপতি কাজ হারাল । রাই হল দেশান্তরী । দু’জনের কেউ ভেবে পেল না , কি তাদের অপরাধ ! অবশ্য জানতে দেরি হল না । জনপদ তো । পদে পদে ছড়িয়ে আছে পাপ । রাই পড়ল পিসির ঘরে বাঁধা । এতদিন তার সাদা মনে যার ছিটেফোঁটা ছিল না , সে–ই বসল মন জুড়ে । তার উচ্ছ্বল কৈশোর কোথায় হারিয়ে গেল । তার তখন রাধার দশা-‘যেমত যোগিনী পারা।‘

বঙ্কুকে খ্যাপায় পাড়ার ছেলেরা ‘ ভাল জায়গাতেই চার ফেলেছিস ! মাছ জমছে ! টোপও গিলছে ! চালিয়ে যা !’ সরল বঙ্কুর ত্রিভুবনে যা ছিল না , তাই বসল মন জুড়ে । সে কেমন বিবাগী হয়ে গেল । কোনো কাজেই মন বসে না । অথচ এই ছেলেই কত কাজের ছিল । সবাই বলত ‘ শিল্পীর ছেলে , শিল্পীই তো হবে।‘

শিল্পীই বটে । বঙ্কুর বাবা মতিলাল যেমন পাকা নেয়ে , তেমনি দক্ষ চাল বারুই । বছরের দু মাস বইত খেয়া । বাকি সময় গ্রামে গ্রামে ছাইত খরের চাল । ডাকের পর ডাক আসত । কাজ করে শেষ করতে পারত না । বৈশাখের খর রোদে চালে বসেই কেটে যেত দিন । মতির হাতে ছাওয়া মানে পাঁচ বছর নিশ্চিন্তি । রবি ঠাকুরের সাধের কুঠির মতি ছাড়া ছাইবে কে । অবাক চোখে তাকিয়ে দেখত বিদেশীরা । বাঁশ বেতের কাজেই বা কম কিসের ! তার হাতে বোনা ধামা , কুলো , মোড়া রঙ মেখে ঝুলত শান্তিনিকেতনের স্টলে । বিমান চরে পারি দিত দেশ বিদেশ । কিন্তু শিল্পের কদর থাকলে কি হবে , শিল্পীর কদর কেউ বোঝে না । গাধার খাটনি খেটে মজুরি জুটত ছকড়া । মতিলালের তাই শিল্পের হাত থাকলেও পেটের ভাত ছিল না । সেই মতিলাল একদিন সর্পাঘাতে মারা গেল । ডাক্তারের হাতে পরলে হয়তো বাঁচত । বিকেলে কেটে ছিল সাপ । সারারাত গুণিনে ঝাড়ফুঁক করল । গেলানো হল জড়িবুটির পাচন । মারা গেল পরদিন দুপুরে । বিষ তেমন জোড়ালো ছিল না ।আহার করা সাপে কেটেছিল হয়তো । কিন্তু গুণিন সংস্কৃতির জাঁকালো ভার তাকে পিষে ফেলল । পরমায়ু না থাকলে যা হয় আর কি ।

বঙ্কুর মা এমনিতেই রোগা । দু’পা হাঁটতে তিন বার বসে । তার অপর স্বামী মরার বছর না ঘুরতেই ছেলেটাও কেমন বদলে গেল । অমন যে কাজের ছেলে , সে এখন কাজের নাম শুনলে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে । ভাবে ওতা আবার কি জিনিস ।শুভানুধ্যায়ীরা বলে ‘ বঙ্কু , সব কাজেই তো তোর পাকা হাত ।নদীর চরে কত বাঁশ । যা না , বাঁশ কেটে ঝুড়ি কুলো বোন , মোড়া বাঁধ । তোর ভাত ভুতে খাবে । তোর আবার ভাতের অভাব ! মা টাকে একটু দেখ । ওতা যে মরেই আছে ।’

মরা আর কতদিন বাঁচে । বঙ্কুর মাও মরল একদিন ।বঙ্কুর সব বাঁধন গেল ঘুচে । বাউল বেশে বেড়িয়ে গেল পথে । কোথায় যে তার কি টান ছিল নদীর সঙ্গে কে জানে ! নব বরষার জলধর যখন অলকা থেকে নেমে আসত রাঢ়ে, বঙ্কু এসে হাজির হ’ত খেয়েঘাটে । নোঙর খুলে গান ধরত ‘ আমায় ডুবাইলি রে , আমায় ভাসাইলি রে / অকুল দরিয়া তোর কূল নাই রে !’

এমনি করেই পেরিয়ে গেল যুগ । এই বার বছরে একবারের জন্যও রাই আর ফিরে আসেনি গ্রামে । ফিরল সেই বিয়ের দিন । পিসির বাড়ি থেকেই বিয়ের পাকা দেখা হয়েছিল । ছেলে পাশের জেলার । তবে জেলাটাই যা আলাদা । দূরত্ব ওই নদীটুকু । শ্রাবণ মাসের শেষ রাতে তার বিয়ে হল । বিয়ের পর বিদেয় হল বর কনে । নৌকা বেয়ে পার করল বঙ্কু । পারের সময় একবারও সে দেখল না পিছন ফিরে । রাইকিশোরী কেমন হল যৌবন কালে ; কনের সাজে দেখতে তাকে কেমন লাগে  – এ সব কিছুই সে দেখল না । বধূর সাজে রাই ওড়নার ফাঁকে ফাঁকে দেখল কেবল বঙ্কু বাউল বৈঠা টানে । ইচ্ছে হল একবার গিয়ে বলে ‘ বঙ্কু , দেখ তো চিনতে পারিস কি না !’ কিন্তু ভাবনা শেষ হওয়ার আগেই নাও ভিরল কূলে । নৌকা ছেড়ে বউ ঊঠল পালকিতে । দিন পেরিয়ে রাত এল । বঙ্কুর তরী বাঁধা পরল ও কূলেই । এ কূলে আর ফিরল না ।

রাত পেরিয়ে দিন এলো । নদী উঠল ফুলে । নদীতে আজ বান জেগেছে । তীরে তীরে মাথা দোলায় গর্ভবতী কাশ । মাঠে মাঠে কেঁপে ওঠে গোছা গোছা ধান । নদী ছোটে কলকলিয়ে । দিন ফুরিয়ে সন্ধ্যা হল । দূরের গাঁয়ে জ্বলে উঠল আলো । বেজে উঠল সানাই । সেই সানাইয়ের ভাঙা ভাঙা সুর গিলে খেল নদী । এক সময় সানাই গেল থেমে । ঝলমলে আলো গেল নিভে । গাঁ ডুবল অন্ধকারে । ওই আঁধারেই রাই পেতেছে ফুলশয্যা ।

বঙ্কু আছে ছইয়ের নীচে নাও গলুয়ের কোলে । বান জাগা নদীর গোঁ গোঁ গর্জন ছাড়া আর কিছুই শোনা যায় না । নেশার ঘোরে ঝিমিয়ে পরা চেতনা থেকে সেই গর্জনও এক সময় ফিকে হয়ে যায় ।

আবার! আবার দুলে উঠল নৌকাটা । না , এ স্রোতের ধাক্কা নয় । বে সামাল পদক্ষেপ ছাড়া নৌকা এমন করে দোলে না । সে খর নদীর পাকা নেয়ে । নৌকার দুলিনি দেখেই বলে দেবে বান আসবে কি না । বঙ্কু উঠে বসে । পাশ ফিরে তাকিয়ে দেখে ছইয়ের পাশে একটা ছায়া মুর্তি । এত রাতে কে আসবে ! তবে কি তার দেখার ভুল ! না , ভুল নয় ! ছায়াটা উঠে এল ছইয়ের ভিতরে । বসল এসে তার পাশে । বঙ্কু চমকে উঠল । ‘ কে! কে!’ ‘আমি গো ! আমি !’ ‘আমি কে!!’ ‘আমি রাই! চিনতে পারছ না ?’ ‘তু—তুমি এখানে !’ ‘ আমার তো এখানে আসারই কথা ছিল !’ ‘ আজ যে তোমার ফুলশয্যা ! শ্বশুর বাড়ি … বর …’ বঙ্কুকে বুকের উপর জাপটে ধরে রাই বলে ওঠে ‘ এই তো আমার বর ! নায়ের গলুই ফুলশয্যা ! নৌকা শ্বশুর দ্গর ! চল না বঙ্কু , এই অজয় হয়ে গঙ্গা বয়ে সাগর পথে চলে যাই স্বর্গে!’

নৌকা ভাসল নদীতে । একে একে সব বাঁধন গেল খুলে । ঘর…বর…শরীর…। উন্মুক্ত বক্ষচূড়ায় বঙ্কু হাত দুটো রেখে গিরিসঙ্কটে মুখ রাখতেই রাই উঠল কেঁপে । জঙ্ঘাদেশের জ্বালামুখ থেকে নির্গত হল লাভা । চরম উত্তেজনায় রাই উরুর ফাঁদে বঙ্কুকে ছেঁদে ফেলতেই তার দৃপ্ত পুরুষালী আমূল সেঁদিয়ে গেল লাভা পিচ্ছিল জ্বালামুখের গভীরে । রাগ মোচনের শিহরণে দুজনেই কাঁপতে থাকে ।

নৌকাটা একবার দুলে উঠল । নদীর খেয়ালে ভাসতে থাকা নৌকা এক সময় এসে পরল ঘূর্ণিস্রোতে । ওরা তখন স্বর্গ দ্বারের কাছাকাছি । ঘুর্ণি স্রোতে নৌকা ঘোরে বন বন বন । হঠাৎ  একটা টাল খেয়ে স্বর্গ পুরের পথিক সমেত স্বর্গরথ তলিয়ে গেল অজয় গাঙের অতল তলে ।


কবি পরিচিতিঃ সুশান্ত কুমার ঘোষ , পুর্বাশাপল্লী , পোষ্টঃ গুসকরা ,জেলাঃ পূর্ব বর্ধমান – ৭১৩১২৮  । পশ্চিম বঙ্গ ।

ফেসবুকের বিকল্প আমার সাহিত্য কমিউনিটি নিবন্ধন করুন এখনি

Amar Sahitto Logo
Amar Sahitto Logo
ফেসবুকে মতামত
 

মতামত দিন

দয়া করে আপনার মতামত দিন
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন