বেঈমান-সুশান্ত কুমার ঘোষ | ছোট গল্প | আমার সাহিত্য

0
40
বাংলা কবিতা | মেঘ-মৃন্ময় -সুশান্ত কুমার ঘোষ

ট্যারা মাধব গাঁটছড়া বাঁধা চাদরটা বাঁ হাতে শক্ত করে ধরে , হাওয়ায় টাল খাওয়া টোপরটা ডান হাতে সামলাতে গিয়ে পিছন ফিরে টেরিয়ে টেরিয়ে দেখছিল নতুন বউকে একে তো ট্যারা । সেই ট্যারা চোখে টেরিয়ে দেখতে গিয়ে উল্টো চালে তার চোখের দৃষ্টি গিয়ে পরে পাল পাড়ানীর চোখের উপর । যদিও মাধব দেখছিল তার তের বছরের কিশোরী বউকে পালপাড়ানি ভেবে বসল তাকেই বুঝি চোখ ঠারে । তাতেই সে গজগজ করছিল । তার উপর নতুন বউকে দেখার আনন্দজাত হাসির ঝলক যখন সদ্য গজানো গোফের চারপাশে ছড়িয়ে পরল , পালপাড়ানি জ্বলে উঠল দপ করে । ওই বাড়িরই ছোটো বউ সে ।   পালপাড়া তার বাপের বাড়ি । পড়শিরা তাই পালপাড়ানি বলেই ডাকে ।

এই পালপাড়ানির চোখে মাধব হাড় বজ্জাত । দু’চোখে তাকে যেন সর্বদা গিলে খায় । আসলে ওটা যে মাধবের চোখের দোষ , চরিত্র দোষ নয় ,এই সত্যটা আর সবাই বুঝলেও পালপাড়ানিকে বোঝানো যায়নি । আসলে মাধব তাকে দু’চোখ ভরে সে ভাবে কখনো দেখেই নি ।  যদি সত্যি সত্যি দেখত , এ অপবাদ তাকে নিতে হত না । মুখের যা শ্রী তার ! চোখ মেলে তাকালে চোখের আলোই হয়তো নিভে যাবে ।

বিয়ের ঝামালা চুকল । নব দম্পতি এল দ্বিরাগমনে । নতুন বউ তো বাপের বাড়ি এসে কেঁদেই আকুল । স্বামী তাকে ভুলেও চোখে চেয়ে দেখেনা ।শরীরেও তেমন সাড়া নাই। … আমাকে হয়তো ওর পছন্দ নয় । অপছন্দের বিয়ে কেন দিতে গেলে । আমি কি তোমাদের বোঝা ছিলাম ! …… নিজের সম্পর্কে নতুন বউয়ের এমন ধারণা জন্মালেও তাকে অপছন্দের কোনো কারণ নেই ।শরত সকালের রোদ্দুরের মত গায়ের রঙ তার । চোখ দুটো যেন শরতের ভরা বিল । সেখানে অবিরত ওঠে ছোটো ছোটো ঢেউ । হাত পায়ের গড়নে আছে শিল্পীর ছোঁয়া । গলার স্বরটি বড় মধুর – বসন্ত প্রাতের ঘুম ভাঙানো পাখি যেন । এমন মেয়েকে চোখ মেলে চেয়ে কে না দেখতে চায় ! মাধবও দেখত , সেই শুভদৃষ্টির সমত থেকেই ।বউ সেটা বুঝল একটু দেরিতে ।  আর শরীর ! তার কি দোষ ! তাকে যে পথে বাইবে , সে পথেই তো যাবে ।

                                                      দুই

সেদিনের নতুন বউ সাবিত্রী এখন দশ বছরের পুরনো ।মধ্য তেইশের দুকুল ভরা পাহাড়ী এক নদী । ক্ষীণ কটিতে , দৃঢ় পয়ধরে সে যেন  অজন্তার জীবন্ত সংস্করণ !  বড় মিষ্টি দেখায় এখন তাকে । অন্তত পাড়া পড়শিরা তাই বলে । তবে পাল পাড়ানি বলে অন্য কথা । পাল পাড়ানি তার খুড়শাশুরি । মাধবের দৃষ্টিতে আগে সে চরিত্র দোষ খুজত । এখন ওটা সয়ে গিয়েছে । তাই ঝাঁঝ কিছুটে কমেছে । তবে হারিয়ে যায়নি । সবে নতুন শাশুরি হয়েছে । বার বছরের মেয়ের বিয়ে দিয়ে নতুন জামাই এনেছে ঘরে ।কত আর বয়স তার ! সাবিত্রীর থেকে বছর পাঁচেকের বেশি তো নয় ।এই বয়েসেই সে শাশুরি মা হয়ে গেল । আর ওই মেয়ে , দিনে দিনে জৌলুস যেন ফেটে পরছে ! ওসব রুপ নিয়ে কি হবে !রুপটা ধুয়ে ধুয়ে জল খাবে নাকি তার  টেরা ভাসুর পো ! ছেলে চাই , ছেলে ! মুখে আগুন দেবে , বেনা গাছে জল দেবে , শ্রাদ্ধে পিন্ডি দেবে ! তার পেটে না হয়  ছেলে জন্মালো না । তিনটেই মেয়ে । ময়নার বাপ রেগে পেটটাও দিয়েছে কাটিয়ে । আর হবার পথ নাই ! সে তো আর ছেলের হাতে আগুন পাবেনা । মেয়েরাই দেবে আগুন মুখে । তিন দিনেই চুকিয়ে দেবে সব । ওর তো সে জোগাড়ও হল না ।  নয় নয় করে দশটা বছর পেরল । মাগি বিয়োবে কবে !

রাগে গিজগিজ করে পালপাড়ানি । জায়ে জায়ে ঠোঁকাঠুঁকি হলে ঝগড়ার মুখে সে কথা শোনাতেও ছাড়েনা । এক উঠোনেই কাজ কর্ম । এবাড়ির ছাগল উঠোন ডিঙিয়ে চলে যায় ও বাড়ির দাওয়ায় । ও বাড়ির হাঁস এসে খেয়ে যায় এ বাড়ির ধান ।এসব নিয়ে জায়ে জায়ে কথা কাটাকাটি লেগেই থাকে । গায়ের ঝাল মেটাতে পালপাড়ানি বলে “ ওই জন্যেই তো নেকনে এত কষ্ট ! কাঁচা বয়েসে ভাতারকে খেলি ,ঘরে আনলি রূপসী বউ ! সেও বাঁজা ! দুদুটো বউ তো মুখে ঝামা ঘসে চলে গেল ঘর ছেড়ে । এখন থাক , বাঁজা বউয়ের চাঁদ মুখ দেখ আর থাক ।মনের গুণে ধন , বুঝলি লো।তোর মনে পাপ আছে যে ! ওই  লেগেই তো বাঁজা মাগী জুটেচে কপালে”।

কথাগুলো ঝগড়ার মুখে হলেও মিথ্যে তো নয় ।মাধবের যখন দু বছর বয়স , তখন ওর বাবা মারা যায় । তিন তিনটে নাবালক ছেলে নিয়ে কপর্দক শূন্য ছাব্বিশ বছরের একটা যুবতীর পক্ষে সমাজ যাপন যে কী ভয়ঙ্কর তা মাধবের মা-ই জানে । থাকার মধ্যে ছিল কেবল দুই ভাইয়ের একখানি ঘর । সংসার চালানোর রসদ বলতে কেবল শরীরটা । গায়ে গতরে খাটলে তবেই জুটবে দুমুঠো ভাত । সেখানেও শান্তি নাই । চাষের সময়টুকুই যা কাজ । বাকী সময় ঘরে বসা । ক্ষেত খামারে গতর খাটিয়ে খাবে , তারও কি জো আছে । চারদিকে ফাঁদ পাতা । মুখে সব লালা ঝড়ে যেন ! চোখ কান তো আর বন্ধ রাখতে পারেনা । কানে শুনেও নাহয় না শোনার ভান করা যায় । কিন্তু গায়ে যদি ঢিল ছোড়ে , শাড়িতে যদি টান মারে – মুখ না খুলে উপায় কি ! বাধ্য হয়েছে মুখ খুলতে , ঝাঁটা ধরতে বঁটি ধরতে ! সে সব গিয়েছে এক দিন । ছেলেরা সব বড় হল । লেগে গেল কাজে ।কিন্তু তার আর সুদিন ফিরলনা ।ঘরে বউ আসতেই বড় ছেলে হাঁড়ী ভেঙে বেড়িয়ে গেল ।মেজোর বেলাতেও তাই হল । বড় তো তাই এক বছর শাশুড়িকে নিয়ে ঘর করেছিল । মেজো দুমাসও রইল না এক সংসারে । অবশেষে মাধবের বিয়ে দিয়ে একটু সুখের দেখা যদিও বা মিলল , সেখানেও বাদ সাধল বিধি । দশ বছর সে শাশুড়িকে নিয়ে এক সঙ্গে ঘর করছে বটে । কিন্তু এখনো পর্যন্ত নাতি নাতনির মুখ তাকে দেখাতে পারলনা ।অথচ তার বড় নাতনি মা হয়ে গেল । বড় ছেলে এখন দাদু ডাক শোনে ।

পালপাড়ানির মুখে ঝাল খাওয়া আর গোপনে চোখের জল মোছা এখন তার প্রতিদিনের কাজ হয়ে উঠেছে । এতদিন পাড়া পড়শিরা গায়ে পরে কিছু বলতে এলে তাদের মুখের উপর শুনিয়ে দিত “ আমরা কাঁচা বয়েসে মা হয়েচি বলে কি সাবিও তাই হবে নাকি ! ও আমার ডাগর বয়েসে মা হবে । মা ওলাই চণ্ডী যেদিন মুক তুলে চাইবে , সেদিন ঠিক হবে”।এ সব বলে পরকে তাড়ান যায় , ঘরকে সে ভোলাবে কেমন করে । তার উপর সেটা যদি দিনরাত ভজনের মত কানের কাছে বাজতে থাকে ! মানুষের মন তো , বিগরে যেতে কতক্ষণ !

সাবিত্রীর শাশুড়ির মনও বিগরে গেল ।যে সাবিত্রী তার চোখের মণি ছিল , আজ সেই যেন বালি হয়ে উঠল । বিয়ের পরপরই শাশুড়ি বিধেন দিয়েছিল তাকে “ ও বউ , আর কিছু করিস আর না করিস , মা ওলাইচন্ডীর থানে পিদিম জ্বালতে ভুলিস না যেন মা” । এতদিন সে কাজ নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করে এসেছে সাবিত্রী। আজ ঘটল ছন্দপতন !

ছাগলে পুঁই খাওয়া নিয়ে দুপুর থেকেই জায়ে জায়ে বেঁধেছিল ।পালপাড়ানির মুখ একবার খুলে গেলে আর সহজে বন্ধ হয় না । পাড়া ওঠে মাথায় । কাক পক্ষীও ঢুকতে ভয় পায় সেখানে । পাড়ার কুকুরগুলোও মাঝে মাঝে ভুল করে তার সুরে সুর মেলাতে শুরু করে । সেই গলা চলল সন্ধ্যে পর্যন্ত । তার শ্রী মুখ নিঃসৃত বাণীর সিংহ ভাগই ছিল সাবিত্রীর “বন্ধ্যা পাচালি”। সেই পাঁচালির অভিঘাতে শাশুড়ির ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে চুরমার হয়ে গেল । মুখপুড়ি যখন তার ঘরেই , তখন পরকে দোষ দিয়ে লাভ কি ।যথা সময়ে সাবিত্রী সাঁঝ বাতি জ্বেলে যাচ্ছিল ওলাইচন্ডীর থানের দিকে । শাশুরি ধরল অগ্নিমূর্তি ! একঝটকায় তার হাত থেকে প্রদীপটা ফেলে দিল । “ বাঁজা মাগী কথাকার ! আবার ঢং করে পিদিম দিতে যেচে ঠাকুর থানে !দশ বচর বিয়ে হল , মাগি এখনো একটা বিয়েন দিতে পারলে না !এত এত লোক মরচে তু’ মরিস না ক্যানে লা! ওই বাঁজা মুক আর কতদিন দেকব!” সে রাতে আর সাঁঝ বাতি ওলাইচন্ডীর কাছে তার যাওয়া হল না । ঘরের খুঁটি ধরে পাথরের মূর্তির মত দাঁড়িয়ে রইল দাওয়ায় ।ঝাল মিটল পালপাড়ানির । বন্ধ হল তার মুখ ।

                                                 তিন

সন্তানহীনতার একটা চাপা যন্ত্রণা মনের মধ্যে ছিল এতদিন । কিন্তু সাংসারিক যন্ত্রণা সাবিত্রীর ছিলনা । স্বামীর বাহ্যিক  ভালবাসা আর শাশুড়ির আদরের ঘেরাটোপে সংসারে এতদিন সুখেই ছিল সে । শরীরের তাপে মাঝে মাঝে পুড়ত বটে , শীতল হওয়ার আগেই গলে যেত মাধব । সেই সব পুড়তে থাকা বিনিদ্র রাত সকাল হতেই সব কেমন শীতল হয়ে যেত । কাজে কাজেই কেটে যেত দিন । ক্ষেত মজুরের মেয়ে হওয়ার সুবাদে সব কাজই সে জানত । কিন্তু শ্বশুর বাড়িতে এসে ক্ষেত খামারের কাজে তাকে যেতে হয়নি কোন দিন । মাধবের এতে ঘোর আপত্তি ছিল । শাশুড়িও পাঠায়নি তাকে । ক্ষেত খামারে পুরুষের মাঝে ভরা যুবতীর দশা কি হতে পারে সে জানে । ক্ষ্যাপা কুকুরের মাঝে পোষা বেড়ালের যা হয় । নিজে সামলেছে বুলিতে , ঝাঁটাতে বঁটিতে । সাবি কি পারবে সে সব সামাল দিতে ! আর ভরসাই বা কি ! অনেক উঠতি ছোকরার নজর আছে তার সাবির উপর । একেলে মেয়ে , আহ্লাদের তাপে গলতে কতক্ষণ । যা সব ক’জন । সব সময় কেমন ছোঁকছোঁক করে ! চাষের কাজ না থাকলে বন বাদারে জ্বালানী কাটতে , মাঠে মাঠে গোবর কুড়োতে শাশুড়িই যায় । সাবিত্রীকে সে সব কাজেও যেতে হয়নি কোন দিন । তার কেবল রাঁধা বাড়া আর ঘর গৃহস্থালি গুছিয়েই খালাস । ঘর ছোটো হলেও সাবিত্রী পরিপাটি করে সাজিয়ে গুছিয়ে রেখেছে এতদিন । চকচকে উঠোন , ঝকঝকে দাওয়া । ঘরে কুটোটি পর্যন্ত পরে থাকতে দেয়না । সংসারে তার যাকিছু ঝগড়া ঝাটি সে এই ঘর দুয়োর সাফ সুতো রাখা নিয়ে । এই নিয়েই মাধবের সঙ্গে তার অশান্তি । মাধব কাজের থেকে ফিরে পরনের পোষাক থেকে সব কিছু ছুড়ে ফেলে এধার ওধার । তাতেই যত রাগ সাবিত্রীর । কতবার বলেছে “ কেন , জামা গেঞ্জি খুলে  সাঙায় তুলে রাখতে পারনা । মেঝেয় ছুড়ে ফেলা আর সাঙায় তোলা তো একই ব্যাপার ।“ কিন্তু মাধবের আর স্বভাব বদলানো যায়নি । শাশুড়ি ঘরে থাকলে সেও ছেলের পক্ষ নেয় -“ও সব মরদ মানুষের কাজ নয় বউ । ওরা মাঠ  ঘাট থেকে তেতে পুড়ে আসে । ও সব গুছিয়ে বাগিয়ে রাখা মেয়ে মানুষের কাজ । তোর কাজ তুই কর মা ।“ সাবিত্রী চুপ করে থাকে না । সেও মুখের উপর বলে দেয়ঃ “ তা বললে তো হবে না মা । পিরেয় ছুড়ে ফেলতে যতক্ষণ , ডাঁসায় তুলে রাখতেও ততক্ষণ।“ শাশুড়ি হাসত দাঁত বের করেঃ “ তোর সঙ্গে কথায় পারি না মা !”

আজ সেই শাশুরির সঙ্গে সাবিত্রীর কাথাই প্রায় বন্ধ । শাশুড়ি তার মুখের দিকে তাকায় না পর্যন্ত । চোখে চোখ পরলে মুখ ফিরিয়ে নেয় । সব সময় গজগজ করে কি যেন বলে । এমন ভান করে , যেন সাবিত্রী তার সামনে না থাকলেই সে স্বস্তি পায় ! মাধবও রাতারাতি বদলে গেল । সাবি যেন তারও চক্ষুশূল হয়ে উঠল । সেদিনের পর থেকে আগের মাধবকে আর পাওয়া গেলনা ।মাধবের এই পরিবর্তন সাবিত্রীর ভাল ঠেকল না । তার মনে হল মাধবের কাছেও সে বুঝি ফ্যালনা হয়ে গেছে । মনের ভিতরে একটা গোপন অন্ধকার থাকলেও , বাইরের জগতটা এতদিন আলো হাসিতে ভর্তি ছিল । কৃষ্ণপক্ষের অনিবার্য ক্ষয়ে ঘর সংসার ধীরে ধীরে অমাবস্যার অন্ধকারে ছেয়ে গেল । শাশুড়ির সঙ্গে ঘরে থাকতে তারও যেন দম বন্ধ হয়ে আসে ।আগে শাশুড়ি তার হাতের কাছে সব জোগাতো । এখন সব কিছুতেই একটা গা ছাড়া ভাব । সাবিত্রী রাঁধতে বসে জোগার পায়না  সব দিন । চাল আছে তো নুন নেই । তেল আছে তো সবজি চাল বাড়ন্ত । একদিন রাঁধতে গিয়ে জ্বালানি কিছু খুঁজে পেলনা সাবিত্রী । শাশুড়িকে সে কথা বলায়  সে মুখের উপর বলে দিল “ পারিস তো জোগাড় করে আন । আমি আর পারিনা”।

দশ বছরের সংসার জীবনে সেদিনই প্রথম ভর্তি দুপুরে সাবিত্রী ঝুড়ি হাতে ঘর থেকে বেড়িয়ে গেল কাঠের খোঁজে ।

                                                     চার

বিতৃষ্ণার শক্তি অতি ভয়ঙ্কর  । মুহূর্তে সব কিছু তছনছ করে মানুষকে উদভ্রান্ত করে তোলে । মানুষ তখন ছুটে চলে দিক শূন্য পথে । সংসারের প্রতি বিতৃষ্ণা সাবিত্রীকে উদভ্রান্ত করে তুলল । তার দিনটা এখন বাইরেই বেশি কাটে । সকালে রান্নার পাট চুকিয়ে ঝুড়ি হাতে বেড়িয়ে যায় কাঠের খোঁজে । রাখালেরা গরু নিয়ে মাঠে যায় । সেও যায় তাদের সঙ্গে গোবর কুড়োতে । তারা সবাই ওর থেকে বয়সে ছোটো । কেউ কেউ নেহাতই বালক । ওদের মধ্যে সিধুই একটু বড় ,ষোল সতের হবে । এই বয়সে ওদের বিয়ে হয়ে যায় । সিধুরও হয়েছে । তবে ওর এগার বছরের পুতুল বউ বছরের ন’মাস বাপের বাড়িতে থাকে । সাবিত্রী পালে পালে ঘুরে ঘুরে গোবর কুড়োয় । মাঝে মাঝে ছায়ায় বসে ছেলেদের সঙ্গে কড়ি খেলে । চু কিতকিত , ডান্ডাগুলি , ধাপসা বাজি খেলার সঙ্গী হয় ওদের । ধুলোর মধ্যে কাঠি হারিয়ে মনের আন্দাজে খুঁজে আনে । এই ভাবেই ঘরের অন্ধকার বাইরের আলোয় মুছতে থাকে সাবিত্রী ।

পৃথিবীর কোন স্থানই যেমন বায়ুশূন্য থাকেনা ,মানুষের মনটাও তেমনি – ওটা কখনো অনুভুতি শুন্য থাকতে পারেনা । বায়ুশুন্য পাত্রের মত অনুভুতিশুন্য হৃদয়ও মুহূর্তে ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যায় । অর্থাৎ সংশ্লিষ্ট হৃদয়ের অধিকারীর অস্তিত্বই বিলুপ্ত হয় । প্রবৃতির বহির্মুখীনতা ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করল সাবিত্রীকে । আকাঙ্খার হেতুটিকেই ধ্বংস করল সে । মাধবের বহির্গমনের পথ ধরেই সিধু এসে হাজির হল সেখানে । ভরিয়ে দিল শূন্যতা । এখন আর জ্বালানি নয় , সিধুর তাপে শীতল হতেই মাঠে আসে সে । গোবর কুড়োতে বেলা ঢলে পরে , তার ঝুড়ি তবু ভর্তি হয়না । কচি কাঁচাদের  এড়িয়ে গরুর পাল নিয়ে সিধু চলে যায় দূরে , অনেক দূরে কাজির আড়ার ওপারে । দিগন্ত জোড়া মাঠ । চারপাশে তিন চার মাইলের মধ্যে কোনো লোকালয় নেই । ফসল শূন্য মাঠে গরু চরে আপন খেয়ালে । সিধু তখন লেপ্টে থাকে সাবিত্রীর শরীরে । নাড়া ওঠা শক্ত মাটি সাবিত্রীকে বিব্রত করে । শরীরের সমস্ত বসন বিছিয়ে দেয় মাটির উপর । সিধুর সোহাগ মাখতে মাখতে দিন কখন ফুরিয়ে যায় বুঝতেই পারেনা । সন্ধ্যার মুখে প্রায় খালি ঝুড়ি হাতে পুকুর থেকে স্নান সেরে চোখ নাচাতে নাচাতে ঘরে ফেরে সাবিত্রী । সাবিত্রীর বুঝতে অসুবিধা হলনা কেন সিধুর এগার বছরের বালিকা বউ বছরের ন’মাস বাপের বাড়ি থাকে । তবে সিধুর দৃপ্ত পুরুষালির পেষণে সাবির দশ বছরের তপ্ত শরীর দশ দিনেই শীতল হয়ে গেল । সাবিত্রীর মনে হল বড্ড দেরি করে ফেলেছে সে ।সংযোগটা আর কিছু দিন আগে ঘটেলেই ভাল হত । অন্তত সিধুর বিয়ের আগে ।

সম্পর্কে জড়ানোর সময়ের হেরফের হতে পারে , কিন্তু কর্মফল ফলে গেল সময়ের হিসাব মেনেই । প্রকৃত পৌরষের সাহচর্যে শস্যবতি হল প্রকৃতি । একদিন সকালে সাবিত্রীর গা আউলে উঠল । নাভি ছিড়ে বেরিয়ে আসে জল । সাবিত্রী এসবের কিছু না বুঝলেও , শাশুড়ি গন্ধ শুকেই বুঝে গেল । এই সামান্য ঘটনার অভিঘাতে সাবির প্রতি তার বিতৃষ্ণা মুহূর্তে উধাও হয়ে গেল । যত্ন করে বিছানায় শুইয়ে পাখার বাতাস দিতে দিতে মাথায় হাত বোলাতে থাকে । হাসিতে ঝলমল করে তার মুখ । শাশুড়ির এই আচরণ সাবিকে বিস্মিত করে । সে ভেবে পেলনা তার এই গা বমি বমি ভাব কি এমন ঘটালো , যাতে আগুনও বরফ হয়ে গেল ।

এমন অভিজ্ঞতা সাবিত্রীর এই প্রথম । ঋতুচক্রের হিসাব সে রাখেনা । রাখবার প্রয়োজন হয়নি কখনো । কবে এল , কবে গেল, সে সব দিন-ই বলতে পারবে , সে জানেনা । গা তো এমন কত আওলায় । এই আওলানোর অন্য কোনো তাৎপর্য সে খুঁজে পায়নি । ওদিকে শাশুড়ি বউকে ঘরে শুইয়ে , হাত পায়ে তেল ঘষে , চারপাশে হাসি ছড়াতে চড়াতে  নাইতে যাওয়ার আগেই চারপাশে রাষ্ট্র করে দিল খবরটাঃ ‘ ওলো , আমাদের সবি খপর করেচে লো ! ছাঁচ পরেচে প্যাটে!” অথচ যার খবর , তার নিজেরই অজানা রইল । আর মাধবকেও কিছু জানায়নি তার মা । ভাবল ওটা তো সাবিই বলবে রাতে , বিছানায় ।

                                                           পাঁচ

খবরটা মাধবের কানে গেল, তবে সাবি নয় পাশের গাঁয়ের পচার মুখ থেকে । তার জীবনে পচন ধরার মূলে এই পচা । সেই পচন আজ সম্পূর্ণ হল । আসলে মাধব কোনো দিন বাবা হতে পারবেনা । পচা- ই এস সর্বনাশের মূল । লোভ মানুষকে পশুরও অধম করে তোলে । পচার লোভও তেমনি তাকে আস্তাকুরে নামিয়ে এনেছিল । দেশে তখন জন্ম নিয়ন্ত্রণের হিড়িক চলছে । কেবল সন্তানবতী মহিলা নয় , বন্ধ্যাত্ব করণের বিনময়ে পুরুষদের ও সরকারি পারিতোষিক মিলছে । দিকে দিকে  দালাল ঘুরছে । বন্ধ্যাত্ব করণের লোক জুটিয়ে দিতে পারলেই মিলছে কমিশন । পচা সেই দালালিতে হাত পাকাল । গ্রামে গ্রামে ঘুরে ঘুরে ধরে আনে লোক । একজন পুরুষকে নাম বদলে পাঁচ বারও নিয়ে গিয়েছে সে । দালাল চক্রের চক্রব্যূহ বেশ জটিল । অদৃশ্য যাদুবলে একই ব্যক্তি পাঁচবার তলপেটে মেকি ব্যান্ডেজ বেঁধে টাকা হাতিয়ে নির্বিবাদে বেড়িয়ে এসেছে । মাধব  পড়ল পচাদের সেই দালাল চক্রের খপ্পরে । মাধবের তখন বিয়ের কথা চলছে । পচা ফেলল টোপঃ ‘টাকাও পাবি , তেজও বাড়বে । অপারেশন করে বাড়িয়ে দেবে জোর।“ বিয়ের নেশায় বিভোর মাধব টোপটা গিলে বসল । ডাক্তার বাবুর কেমন সন্দেহ হল । ছুড়ি ধরতে রাজি হলেন না তিনি । কিন্তু কাগজে তার বয়স দেখানো হয়েছে পঁচিশ । তার মুখ দিয়ে বলানো হল “ আমি তিন ছেলে মেয়ের বাপ। বিয়ে করেছি ছ’বছর।‘ ডাক্তার বাবু কাজ সেরে দিলেন । বিদায় কালে নার্সরা রসিকতা করে বললেনঃ ‘যাও মাধব, বউ নিয়ে যত খুশি আনন্দ করো । আর সংসার বাড়ার ভয় নেই ।‘ মাধবের মাথায় পড়ল বাজ । কিন্তু ততক্ষণে যা হওয়ার হয়ে গেছে । পচাও তখন পাওনা হাতিয়ে চলে গেছে সেখান থেকে । পরে ধরেছিল পচাকে । সে মাধবকে সামাজিক লজ্জার ভয় দেখিয়ে তার মুখ বন্ধ করে দিয়েছিল । নিজের নিরাপত্তার কথা ভেবে পচাও গোপন করে গিয়েছিল ব্যাপারটা । কিন্তু আজকের এই জবর খবরে মাধবকে বিদ্রুপ করার লোভ সম্বরণ করতে পারলনা ।

নতুন ইঁটভাঁটা শুরু হয়েছে । মাধব সেখানে কাজ করে । দিনের কাজ শেষ হলে ঠিকা চুক্তির ভিত্তিতে রাতেও সেখানে কাজ করে মাঝে মধ্যে । সেদিন বাড়ি ফেরেনা । ভাঁটার শ্রমিক ছাউনিতেই থেকে যায় । মাধব ইঁট ভাঁটাতেই শুনল খবরটা । পচা বিদ্রুপের সুরে বললঃ ‘ কিরে মাধব , তুই বাপ হচ্ছিস শুনলাম !” রসিকতা ভেবে মাধব প্রথমটায় তেমন আমল দেয়নি । হেসে উড়িয়ে দিয়েছিল । কিন্তু সবাই যখন একে একে বলল ,তার মা –ই দিয়েছে খবরটা , মাধব খাওয়ানোর ভয়ে অস্বীকার করছে , মাধব তখন চোখে দেখল অন্ধকার । ঘরে ফিরেই সে মায়ের কাছে জানতে চাইল খবরের সত্যতা । মা হেসে বললঃ ‘ঢঙ দেখো ছেলের ! বউয়ের কথায় কি বিশ্বাস হচ্ছে না ! মাকে শুদুতে হয় উসব কথা!” মাধবের পায়ের তলার পৃথিবী তখন ভয়ঙ্কর কম্পনে তছনছ হতে থাকে ।

সাবিত্রী ততক্ষণে জেনে গিয়েছে সে মা হতে চলেছে । শাশুড়ির প্রশংসায় গর্বে তার বুক ভরে ওঠে । সে মনে মনে ঠিক করে  রেখেছে , বেশ দেমাক নিয়েই মাধবকে জানাবে খবরটা । মানুষের ভাবনার সঙ্গে তার ভবিতব্য খুব একটা মেলেনা । সাবিত্রীরও মিললনা । যা ভেবেছিল , ঘটল তার সম্পূর্ণ বিপরীত । সুখবরটা দিয়ে মাধবকে চমকে দেওয়ার পরিবর্তে মাধবের জীবনে ঘটে যাওয়া মর্মান্তিক সত্যটা শুনে এক মুহূর্তে সাবিত্রীর রঙিন পৃথিবী ধূলিসাৎ হয়ে গেল । সে রাতে আর ঘুমাতে পারলনা কেউ ।

                                                        ছয়

সারাটা দিন সাবিত্রীর কানে বাজতে থাকে মাধবের কথাগুলোঃ ‘ ঠকালি আমাকে! বেইমানি করলি আমার সঙ্গে!’ সকালে কাজে যাওয়ার সময় মাকে বলে গেলঃ ‘আজ আর ঘুরবনা! ভাঁটাতেই থাকব রেতে!’ রাত নামতেই সারাদিনের পরিশ্রান্ত শাশুড়ি খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ল । সাবিত্রীর আর ঘুম এলোনা । অন্ধকার দাওয়ায় দেওয়ালে ঠেস দিয়ে পাথরের মত বসে রইল । সময়ের কোন হিসাব নাই । এক সময় ধীরপায়ে বেড়িয়ে আসে ঘর থেকে । যন্ত্র চালিতের মত এগিয়ে যায় সিধুর বাড়ির দিকে । দরজায় টোকা মারে । বেশ কয়েকবার টোকা মারার পর শব্দ শুনে আগুরের দরজা খুলে বাইরে এসে সামনে সাবিকে দেখেসিধু তো আনন্দে আত্মহারা । ভাবল , এই দু’দিন সে মাঠে যায় নাই তাই সাবি এসেছে ঘর বয়ে । ঘরের বিছানায় সাবিকে নিয়ে রাতটা তার ভালই যাবে , এইসব ভেবে খপ করে সাবিত্রীর একটা হাত চেপে ধরে তাকে টেনে ঘরের ভিতরে ঢোকাতে ঢোকাতে চাপা গলায় বলেঃ ‘ভেতরে এসো তাড়াতাড়ি । কেউ দেখে ফেলবে।‘ সাবিত্রী সিধুর অন্য হাততা ধরে বাইরের দিকে টানতে টানতে বলেঃ ‘ বাইরে চল । কথা আছে।‘ সিধু কোন প্রশ্ন না করে আগুরটা আলতো করে টেনে নিঃশব্দে বেরিয়ে আসে ।

দু’জনে গ্রাম সীমানার পুকুর পাড়ে বটগাছটার নীচে এসে বসল । সাবিত্রী একে একে বলে গেল ঘটনার আদ্যপান্ত । সব শেষে  সাবিত্রীর সকাতর অনুরোধঃ ‘ চল না সিধু ,আমরা দূরে কোথাও চলে যাই ! যে আসছে , সে তো তোরই ! ওকে নিয়ে ঘর বাঁধি নতুন করে !’ এতক্ষণ সাবিত্রীই বলেছে । সিধু শুনে গিয়েছে নীরবে । তার কথার মাঝে সিধু একটা শব্দও উচ্চারণ করে নাই । এবার সিধু অত্যন্ত ঠান্ডা গলায় বললঃ ‘ সিটো কি করে হয় । তোমার ঘরে মরদ আচে । আমারও বউ আচে ঘরে । এখন না হয় কাঁচা বয়েস । দু’দিন বাদে ডাগর হলেই থাকবে আমার কাচে । তোমাকে নিয়ে পালিয়ে গেলে উটো তো আর  আসবেনা !’ আর কোনো কথা নেই কারোর মুখে । ঝিঁঝিঁর ঝিল্লি , রাতচোরা পাখির পাখার ঝাপট , শেয়ালের দূরাগত হুক্কাহুয়া ডাক – কোনো কিছুই এই স্তব্ধতাকে ভাঙতে পারেনা । স্তব্ধতা ভাঙে সাবিত্রী । বরফ শীতল কন্ঠে বলেঃ ‘ তবে যা  সিধু , ঘরে যা !’ সিধু মন্ত্রমুগ্ধের মত সেখান থেকে উঠে অন্ধকারে মিশে যায় । একলা সাবিত্রী যুদ্ধ করে অন্ধকারের সঙ্গে । সে একা !অবশিষ্ট পৃথিবী আর এক দিকে । সে লড়াইয়ে যুদ্ধাস্ত্রের ঝঞ্ঝানি অবিরত শব্দ তোলেঃ ‘ ঠকালি আমাকে ! বেইমানি  করলি আমার সঙ্গে !’ এই দশ বছরে প্রতিটা মুহূর্ত যে তাকে ঠকিয়ে এলো ! সে অস্ত্র ঘৃণা ভরে প্রত্যাখ্যান করেই বেরিয়ে এসেছে ঘর থেকে । গত দুমাস ধরে তিলতিল করে যে তাকে ঠকিয়ে এলো ,  কয়েক মুহূর্ত আগেও যে দাঁড়াল এসে মুখোমুখি ! সে অস্ত্র ছুঁয়েও দেখল না! একাই লড়ল সাবি ! অস্ত্র তার সংস্কার !পৃথিবীর আদিম আদিমতম অস্ত্র ! পলকা , ভঙ্গুর এবং অচল !   হেরে গেল সাবিত্রী ! অসম যুদ্ধে  বড্ড বে-আব্রু পরাজয় ঘটল তার !

                                                 সাত

পরদিন সকালে সিধুর বাবাই প্রথম দেখল । পুকুর পাড়ে প্রাতঃকৃত্য সারতে সে-ই যায় সবার আগে । সেদিন প্রাতঃকৃত সেরে বটতলায় আসতেই থমকে গেল পা ! সাবিত্রীর নিথর শরীর ঝুলছে বটের ডালে । দ্বিতীয় খবরটা এল তার কিছু পরেই । রাতে ইঁটভাটায় কাজ করে ফেরার পথে পাঁচ জন ভাঁটা শ্রমিক তেঁতুল ডোবার পারে উঠতেই চমকে উঠল ! সেখানে মুখ থুবড়ে পরে আছে মাধবের প্রাণহীন দেহ !


কবি পরিচিতিঃ সুশান্ত কুমার ঘোষ , পুর্বাশাপল্লী , পোষ্টঃ গুসকরা ,জেলাঃ পূর্ব বর্ধমান – ৭১৩১২৮  । পশ্চিম বঙ্গ ।

ফেসবুকের বিকল্প আমার সাহিত্য কমিউনিটি নিবন্ধন করুন এখনি

Amar Sahitto Logo
ফেসবুকে মতামত
 

মতামত দিন

দয়া করে আপনার মতামত দিন
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন