লালসার গ্রাস-সুশান্ত কুমার ঘোষ | নাট্যকাব্য

0
33
বাংলা কবিতা | মেঘ-মৃন্ময় -সুশান্ত কুমার ঘোষ

লালসার গ্রাস

সুশান্ত কুমার ঘোষ


মাটিঃ  দারুণ দহন পেড়িয়ে এলাম আষাঢ় তো আজ এল

মেঘ কুমারী ! এ কী কাণ্ড ! কি ছলনা ছলো !

সূর্য দেখায় প্রবল প্রতাপ প্রথম আষাঢ় দিনে

যাচ্ছে পুড়ে শরীর আমার তোমার পরশ বিনে !

মেঘ কুমারী ! কোথায় তুমি ? পাই না কেন সাড়া ?

কেন আমায় ছল দেখিয়ে করছো দিশা হারা ?

শরীর আমার ঝলসে গেছে , হৃদয় গেছে পুড়ে

একটু খানি মায়াও কি আজ জাগছে না অন্তরে ?

মেঘ ঃ অন্তর ! তাকে কোথায় পাব ? বৃথাই তাকে খোঁজা ।

চতুর্দিকে শুধুই তোমার অপরাধের বোঝা !

তাদের চাপে হৃদয় আমার মরেই গেছে কবে

জীর্ণ জড়া মেঘকে ডেকে আর বল কি হবে !

কী পাবে এই মরার কাছে ? কীই বা দেওয়ার আছে ?

সব দিয়েছি উজাড় করে যখন ছিলাম বেঁচে ।

নিজের হাতে মারলে যাকে তারই সেবা চাও ?

দায়ে পরে মরার কাছে প্রাণের বেদন গাও !

মাটি ঃ মেঘ কুমারী রঙ তামাশার সময় এখন নয় ,

চেয়ে দেখ রুদ্র রবির দহন শরীরময় !

বড্ড জ্বালা ! সইছে না আর ! সব গিয়েছে পুড়ে!

এসো তুমি মেঘ কুমারী এসো আমার ঘরে ।

সয়না জ্বালা সয়না গো আর সব গিয়েছে জ্বলে

কেন আমায় দিচ্ছ দাগা রসিকতার ছলে !

মেঘ ঃ রসিকতা করছি না গো করছি না কো ছল !

তোমার কাছে যাওয়ার জন্যই লড়ছি অনর্গল !

লক্ষ কোটি সূর্য সেনা আমায় আছে ঘিরে

পথের মাঝেই বন্দী হলাম রুদ্র লু এর বেড়ে ।

ভাঙব তাকে কিসের তেজে ? শক্তি কোথায় পাই ?

আমার সাথের সই সখীরা কোথাও যে আর নাই ।

মাটি ঃ এই তো আমি তোমার সাথি , তোমার ভালোবাসা!

তোমার যত সুখ আহ্লাদ তোমার যত আশা ।

আমার প্রেমের শক্তি দিয়েই বাধার ব্যূহ ভেঙে

সিক্ত করে শীতল করো , দাও এ হৃদয় রেঙ্গে ।

মেঘ ঃ আহা ! আমার প্রাণের সুজন ! যাই মরে যাই মরে !

আর কোরো না তোমার প্রেমের বড়াই দয়া করে ।

সত্যি যদি সুজন হতে থাকত যদি হিয়া

সত্যি যদি বাসতে ভালো হতে দরদিয়া

তাহলে কি হয় গো তোমার এমন পরিনতি !

আজকে দেখি দরদ তোমার ভীষণ আমার প্রতি ।

মনের ভিতর এমন দরদ থাকত যদি আগে

সই সখীদের দেখতে যদি একটু অনুরাগে

তাহলে কি জড়া এসে পারত আমায় ছুঁতে ?

যদি তুমি সত্যিকারের দরদিয়া হতে ?

মাটি ঃ কী বলো গো মেঘ কুমারী ! দরদ আমার নাই ?

নিঠুর আমি ? মিথ্যে আমার ভালোবাসাটাই ?

মেঘ ঃ মিথ্যে মেকি নকল কি না দারুন এই দুর্দিনে

জাগিয়ে বিবেক চেতন আলোয় আপনাকে নাও চিনে ।

লড়ছি যত কঠিন লড়াই কমছে তত আয়ু

তোমার ভুলেই ফুরিয়ে যাবে আমার পরমায়ু !

আমি ছাড়া নিঃস্ব তুমি তোমার কিছু নাই

এক লহমায় ধ্বংস হবে তোমার ভুবনটাই ।

মাটিঃ একি বল মেঘ কুমারী ! কি শুনি আজ কানে !

হৃদয় আমার যাচ্ছে ফেটে তোমার কথা শুনে ।

আমার সকল ভালোবাসা দিলাম যাকে তুলে

সে –ই কিনা আজ কপাল গুনে আমায় চড়ায় শূলে !

প্রণয় আমার নয় গো মেকি ! নাই ফাঁকি এক চুল

বল তবে পাপটা কিসের ? কোথায় আমার ভুল ?

প্রেম যা ছিল বুকের মাঝে সব দিয়েছি ঢেলে

নিঠুর তুমি ! দুর্দিনে তাই যাচ্ছ আমায় ফেলে !

মেঘঃ আমি যদি নিঠুর হতাম কবেই যেতে ফেলা

সাজিয়ে রাখি ভুবন তোমার সরিয়ে হাজার হেলা ।

তোমার দেওয়া যন্ত্রণাকে ভিজিয়ে চোখের জলে

বাঁধি তোমায় নিবির প্রেমে সব বেদনা ভুলে ।

পরাণ আমার ডুকরে কাঁদে তোমার কাছে যেতে

উঠছে না গো উঠছে না পা পড়ছে না পা পথে ।

চিরটা কাল তোমার ছিলাম আজও তোমার আছি

তোমার ভুলেই আজকে আমি নিঃস্ব হয়ে গেছি ।

পঙ্গু আমার চপল চরণ তোমার লোভের কোপে

কেমন করে ঝড়ব আমি তোমার বুকে ঝেঁপে ।

হৃদয় আমার যাচ্ছে ফেটে তোমার দশা দেখে

ছুটছি আমি ছুটছি গো তাই ছুটছি সকাল থেকে ।

দেহে যখন জোয়ার ছিল ছুটিয়ে দিতাম বান

আজকে আমার শরীর জুড়ে শুধুই ভাঁটির টান ।

ভর যুবতী মেঘতনু আজ জড়ায় ছেয়ে গেছে

জড় বুড়ি আজ কেমন করে আসবে তোমার কাছে ?

মাটিঃ মেঘ কুমারী বল আমার কোন পাপে কোন ভুলে

এমন করে জড়ার জালে বন্দী তুমি হলে ?

মেঘঃ তোমার যত খেয়াল খুশি আকাশ ছোঁয়া সাধ

তিলে তিলে আমার জীবন করেছে বরবাদ !

তোমার লোভের মহীরুহ আকাশ ছোঁয়ার মোহে

পলে পলে বিষ ঢেলেছে আমার সারা দেহে ।

বিলাস ব্যসন আয়েশ আরাম শৌখিনতার ঘোরে

বোধ বুদ্ধি বিবেক তোমার কবেই গেছে মরে ।

বিষ খাচ্ছ বিষ মাখছো করছো বিষেই স্নান

তোমার দেওয়া বিষে বিষেই বিষিয়ে গেল প্রাণ ।

মাটিঃ মেঘ কুমারী ! অবাক কথা ! কোথায় দিলাম বিষ ?

আমি কেবল তোমার ধ্যানে মগ্ন অহর্নিশ !

কেবল ভাবি তোমার কথা আসবে তুমি কবে

কোন লগনে তোমার আমার মধুর মিলন হবে !

যে মিলনের অপেক্ষাতে জগত থাকে বসে

তুমি এলেই সৃষ্টি সুখে ভুবন যাবে ভেসে ।

এখন তবে কেন মিছে বিষের কথা বল

মেঘ কুমারী ! এসো নেমে ! প্রাণ যে কাতর হল !

মেঘ ঃ বিষ ফোঁড়াতে যাচ্ছে গলে শ্যামল তনু যার

চোখের দেখায় কোনোখানে বিষ মেলে না তার !

বোধ গিয়েছে বুদ্ধি গেছে বিবেক গেছে জানি

শ্রবণ ঘ্রান সব গিয়েছে চোখ ঢেকেছে ছানি !

ভেবেছিলাম অনুভূতির ছায়া কিছু আছে

অহঙ্কারের অন্ধকারে সেটাও ঢেকে গেছে ।

পাচ্ছ না তাই দেখতে কিছু কোথায় তোমার ভুল

আজও তুমি লোভ লালসা আকাঙ্খায় মশগুল ।

আরাম চেয়ে ব্যারাম মেলে খেয়াল তবু নাই

আস্ত তোমায় খাচ্ছে গিলে তোমার লালসাই ।

আরাম আয়েশ বিলাস প্রমোদ সব মিলাতে গিয়ে

তোমার হাতে তিলে তিলে তুমিই গেলে ক্ষয়ে !

বিষ মাখালে আমার দেহে বিষ মাখলে তুমি

মেঘ কুমারীর এসিড তনু ! তেজস্ক্রিয় ভূমি !

হয়তো আমি আসব নেমে হয়তো মিলন হবে

কিন্তু সে তো বন্ধ্যা মিলন ! সৃষ্টি কোথায় পাবে !

মাটি ঃ বুঝেছি গো মেঘ কুমারী কোথায় আমার পাপ !

কোন মুখে আজ চাইব আমি এমন ভুলের মাপ !

লোভের করাত লালসার দাঁত আকাঙ্খার হুল মিলে

আপন প্রাণের রস রক্ত নিজেই খেলাম গিলে ।

সর্বনাশা নেশার মোহে জড়িয়ে মরণ ফাঁদে

শমকে দিলাম শৌর্য যত আনন্দে আহ্লাদে !

পাইনা খুঁজে কেমন করে কোন পাপে কোন ভুলে

আমার সুখের ভুবন কখন যমকে দিলাম তুলে !

মেঘ ঃ ভেবে দেখো গুহা ছেড়ে বেড়িয়ে এলে যবে

সভ্য প্রাণীর নিশান তুলে মাতলে  মহোৎসবে ।

সেদিন থেকেই আকাঙ্খাকে প্রাণের দোসর করে

জিঘাংসা লোভ দ্বেষ ঈর্ষা লালসার হাত ধরে

মহোল্লাসে দিকে দিকে ছড়িয়ে গেলে সব

নানান রিপু দিকে দিকে তুলল নানা রব ।

চলল করাত বসল নগর উঠল মিনার চূড়া

অহঙ্কারের দম্ভে আমার শরীর গেল ফোঁড়া !

বিষ উঠল দিকে দিকে লাগল আমার গায়ে

পেলব কোমল শরীর আমার পচেই গেল ঘায়ে !

সই সখিরা মলম দিত সবুজ সবুজ হাতে

দম্ভ তোমার বিষ মাখালেও গা জুড়োতো তাতে।

নগর গড়ে মিনার তুলে যন্ত্র দিয়ে ঘিরে

উঠলে মেতে অহঙ্কারে দেখলে না আর ফিরে ।

সবপেয়েছির সোনার কাঠি হাতের মুঠোয় পেতে

উঠলে তুমি সই সখিদের নিধন যঞ্জে মেতে।

সই সখিদের পাড়ায় পাড়ায় সসস্ত্র সন্ত্রাস

কত যে সই পড়ল কাটা উঠল কত বাস ।

তোমার লোভে তোমার পাপে তোমার অহঙ্কারে

তোমার বুকের পাঁজরগুলোও চূর্ণ একেবারে !

ভাঙলে কত পাহাড় চূড়ো হাড়গোড় সব গিলে

মোহের বশে হৃৎপিণ্ডেই দাঁত বসিয়ে দিলে ।

হা হুতাশে মিলবে না ফল লোভকে ফেল ছুঁড়ে

সর্বগ্রাসী আকাঙ্খাকে সরিয়ে রেখে দূরে

বিবেক জাগাও বোধকে ওঠাও খোল চেতন দ্বার

নইলে প্রিয় ভুবন তোমার সব হবে ছারখার !

মাটি ঃ ক্ষমা করো মেঘ কুমারী ! আমার ভুলের ফাঁদে

আজকে আমার রিক্ত জীবন হা হুতাশে কাঁদে ।

ভুল করেছি লক্ষ কোটি মিলছে তাদের ফল

তুলব না আর আকাশ মিনার পাতব না আর কল।

কাটব না আর সবুজ সখা ঢালব না আর বিষ

তাদের সেবায় মগ্ন আমি থাকব অহর্নিশ ।

যা কেটেছি তার কোটিগুণ সবুজ দেব ভরে

বিলাস ব্যসন আরাম থেকে থাকব বহুদূরে ।

সত্যিকারের সভ্য হবো গড়ব নতুন পথ

সে পথ ধরেই এগিয়ে যাবে নতুন যুগের রথ ।


কবি পরিচিতিঃ সুশান্ত কুমার ঘোষ , পুর্বাশাপল্লী , পোষ্টঃ গুসকরা ,জেলাঃ পূর্ব বর্ধমান – ৭১৩১২৮  । পশ্চিম বঙ্গ ।

ফেসবুকের বিকল্প আমার সাহিত্য কমিউনিটি নিবন্ধন করুন এখনি

Amar Sahitto Logo
ফেসবুকে মতামত
 

মতামত দিন

দয়া করে আপনার মতামত দিন
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন