নারীশ্বর লিখেছেন অমল ভট্টাচার্য্য | গল্প | আমার সাহিত্য

নারীশ্বর
অমল ভট্টাচার্য্য
———————-
কৃশানু আজকে তার স্ত্রী ঊষাকে সাথে নিয়ে মুম্বাই এর ছত্রপতি শিবাজী বিমান বন্দরে উপস্থিত। চেক ইন হবে। লাইনে দাঁড়িয়ে কৃশানু এবং তার স্ত্রী ঊষা। উত্তেজনায় আনন্দে কৃশানুর হাতে ধরা বিমানের টিকিট ও পাসপোর্ট কাঁপছে। কৃশানু চলেছে স্ত্রী ঊষাকে নিয়ে ক্যালিফোর্নিয়া।
আজ থেকে কয়েক বছর আগেও কৃশানু কখনও ভাবেনি যে সে ক্যালিফোর্নিয়া যাবে। ক্যালিফোর্নিয়া তো অনেক দূরের ব্যাপার। ঘরের কাছে পুরী, নিজের রাজ্যের দার্জিলিং, কিংবা কেরালার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য কিছুই দেখা হয়নি। কি করে হবে ? সরকারি চাকরি করে বহু কষ্টের তারকাঁটা পেরিয়ে এক ছেলে ও এক মেয়েকে মানুষের মতো মানুষ করেছে। এখনও ভাড়া বাড়িতে থাকে। দুবছর আগে রিটায়ার করে যে টাকা পেয়েছে তা দিয়ে আর যাই হোক বাড়ি হয়না। সামান্য পেনশন আর রিটায়ার করার সময়ের এককালীন টাকার প্রাপ্ত সুদেই তাদের দুজনের চলে যায়। এইরকম পরিবেশের কৃশানু আর ঊষা চলেছে ক্যালিফোর্নিয়া।
আজ থেকে এক বছর আগেই মেয়ে সুতপার বিয়ে দিয়েছে সে। সুতপা কোলকাতা ইউনিভার্সিটি থেকে ইংরেজি নিয়ে পড়াশোনা করেছে। তার স্বামী রঞ্জন  আইটি ইঞ্জিনিয়ার। ব্যাঙ্গালোরে থাকে।
কৃশানুর ছেলে অশেষ। প্রেসিডেন্সী কলেজ থেকে জিওগ্রাফি তে অনার্স নিয়ে পড়াশোনা করে উচ্চ শিক্ষার জন্য ক্যালিফোর্নিয়া ইউনিভার্সিটি তে চলে যায়। মেধাবী ছাত্র অশেষ। এখন সে সেখানে গ্লোবাল ওয়ার্মিং এন্ড ইটস এফেক্ট টু সোসাইটি এর উপর গবেষণা করছে ম্যাডাম থমাসের অধীনে।
চেক ইন হয়ে গেছে। ইমিগ্রেশন হয়ে গেছে । কৃশানু ভাবছে, সে তার বাবার মুখে শুনেছে যে তারা একসময়ে নাকি জমিদার ছিল। মনে মনে হাসি পায় কৃশানুর। যার পায়ের নীচে এক ছটাক জমি নেই, সে আবার জমিদার বংশের। ভাবতেই ঘৃণা বোধ জেগে ওঠে কৃশানুর মনে ঐ জমিদার শব্দের উপর। মূহুর্তে সে নিজেকে সামলে নেয় আর মেধাবী পুত্র ও কন্যার কথা ভেবে তার ঠোটের কোনে হাসির ঝিলিক খেলে যায়।
মাসখানেক আগে হঠাৎই ছেলে অশেষ ফোন করে বাবাকে বলে তোমাদের এখানে আসতে হবে। আমার গবেষণায় সাহায্য করতেই তোমাকে আসতে হবে। আকাশ থেকে পড়ে কৃশানু। গবেষণায় আমি তোকে কিভাবে সাহায্য করতে পারিরে ? বাবা, তুই মস্ত শিক্ষায় শিক্ষিত। আমিতো সাধারণ গ্র্যাজুয়েট, কোনোরকম ভাবে চাকরি শেষ করেছি। অশেষ কোনো কথাই শুনতে চায়না। সে বলে, তোমরা না এলে আমার থিসিস কমপ্লিট হবেনা, তোমাদের আসতেই হবে। চিন্তা করোনা, তুমি পাসপোর্ট , ভিসার ব্যবস্থা করো, আমি তোমাদের যাতায়াতের সব ব্যবস্থা করব। আমি যে স্টাইপেন পাই তা থেকে যা জমিয়েছি তা দিয়ে তোমাদের সব ব্যবস্থা করতে পারবো।
মাস তিনেক আগে ম্যাডাম থমাস তার অধীনে কর্মরত পাঁচ গবেষককে তার বাড়িতে নিমন্ত্রণ করেন। ম্যাডাম থমাস , ভালো বাংলা বলতে জানেন কারণ তিনি সুদূর আমেরিকা থেকে কোলকাতায় এসেছিলেন প্রেসিডেন্সী তে পড়াশোনা করতে আজ থেকে প্রায় চল্লিশ বছর আগে। অদৃষ্টের কি পরিহাস, একটা সময় ছিল যখন বিদেশ থেকে উচ্চ শিক্ষার জন্য আমাদের দেশে ছাত্র ছাত্রী রা আসতো আর এখন আমাদের দেশের ছেলেমেয়েদের বিদেশ যেতে হয় উচ্চ শিক্ষার জন্য। যাই হোক, সেই নিমন্ত্রণ পার্টিতে অশেষের মোবাইলে তার বাবা মাএর ছবি দেখেই আঁতকে ওঠেন ম্যাডাম থমাস। তার চোখের কোনে অশ্রু কণা জমা হয় যা উপস্থিত সকলের দৃষ্টির অগোচরেই থেকে যায়। এই ঘটনার দিন দুয়েক পরেই ম্যাডাম থমাস অশেষকে তার বাড়িতে ডেকে পাঠান। অশেষ ম্যাডামের অত্যন্ত স্নেহভাজন ছাত্র। ম্যাডাম সরাসরি অশেষকে বলেন, অশেষ আমি তোমাকে অত্যন্ত স্নেহ করি আর তুমিও খুব মেধাবী। কিন্তু একটা কথা জেনে রাখো, শুধু মেধা দিয়ে সবকিছু হয়না। থিসিস কমপ্লিট করতে তোমার আর মাস ছয়েক বাকি, কিন্তু তার আগে আমি তোমার বাবার সাথে মিলিত হতে চাই। সেদিন তোমার মোবাইলে তোমার বাবার ছবি দেখার পর থেকে আমার মনে শুধু উনিই বিচরণ করছেন। ব্যবস্থা করো ওনাকে এখানে আনার। টাকার অসুবিধা থাকলে আমাকে বলো। আর হ্যাঁ, তোমার বাবা এখানে আসার পর একটা পুরো দিন রাত আমি ওনার সাথে কাটাবো, সেখানে সকলের প্রবেশ নিষিদ্ধ। যাও, যদি গবেষণা সম্পূর্ণ করতে চাও ওনাকে আনার ব্যবস্থা করো।
অশেষের কান লাল হয়ে যায়। কি বললেন ম্যাডাম এসব ? ম্যাডামের তো বয়স হয়েছে তবুও তার এইসব রাত কাটানোর কথা বলতে লজ্জা হলোনা। অশেষ তো কখনও ম্যাডামকে এরকম ভাবেনি। কি করবে এখন অশেষ ? দুরাত অশেষ ঘুমাতে পারেনা। কোনও রাস্তা খোলা নেই তার সামনে। মাত্র ছয়মাস বাকি গবেষণা সম্পূর্ণ হতে। এখন আর কোনও রাস্তা খোলা নেই। এরপরই সে বাবাকে ফোন করে।
বিমান ক্যালিফোর্নিয়া পৌঁছনোর পরে অশেষ তার বাবা মাকে নিয়ে তার ঘরে পৌঁছে যায়। অনেকদিন পর ছেলেকে পেয়ে বাবা মায়ের আনন্দ আর ধরেনা। এদিকে অশেষ ভাবে, কি করে সে তার বাবাকে বলবে যে তার গবেষণা সম্পূর্ণ করতে তাকে তার ম্যাডামের সাথে একটা দিন রাত কাটাতে হবে। ভাবতেই গা ঘিনঘিন করে ওঠে অশেষের। মেয়েদের উপর একটা বিতৃষ্ণা জন্ম নেয়। সে ভাবে, পুরুষরাই তো মহিলাদের শোষণ করে, এটাই সে জেনে এসেছে। এখনতো দেখছে, উল্টোটাও হয়। আর ভাবতে পারেনা অশেষ।
পরদিন  অশেষ তার বাবাকে নিয়ে একটা কফি শপে গিয়ে বসে। কৃশানু ছেলেকে জিজ্ঞাসা করে, বল আমি তোকে কিভাবে গবেষণায় সাহায্য করতে পারি। অশেষ বলে, বাবা ছেলে হয়ে আমি নিজের মুখে তোমাকে সে কথা বলতে পারবোনা। এই বিশ্বসমাজ এক কুৎসিত ভোগবাদে ডুবেছে আর তা থেকে আমার তোমার কারো রেহাই নেই। এই কাগজে লেখা আছে, তোমাকে যা করতে হবে। কৃশানু ছেলের কথায় অবাক হয়ে যায়। সে ভেবে পায়না , কি এমন কাজ তাকে করতে হবে। ছেলের হাত থেকে কাগজটা নিয়ে নেয়, সেখানে লেখা আছে — ম্যাডাম থমাসের সাথে তোমাকে একটা পুরো দিন ও রাত কাটাতে হবে। লেখাটা পড়েই কৃশানু ছেলেকে জিজ্ঞাসা করে, এসবের মানে কি ? দরকার নেই এরকম ভাবে গবেষণা সম্পূর্ণ করার। আমি তোর মাকে কি জবাব দেবো ? তার সাথে এত বড় বিশ্বাসঘাতকতা আমি করতে পারবোনা। অশেষ বলে, বাবা আমি জানি এ এক অন্যায় আবদার। কিন্তু আমার কথাটাও একটু ভাবো। সারাজীবন তুমিতো আমার ভালোই চেয়েছ। কৃশানু চেঁচিয়ে ওঠে, তাই বলে তোমার মায়ের বিশ্বাস আমাকে বিকিয়ে দিতে হবে ? বাবা, একটু বোঝার চেষ্টা করো। কৃশানু আর কোনো কথা বাড়ায়না।
ঊষা দেখছে গত দুদিন ধরে কৃশানু কেমন মনমরা হয়ে বসে আছে। ছেলের সাথেও সেরকম কথা বলেনি। কেন এরকম, জিজ্ঞাসা করায় কৃশানু বলেছে, না শরীর টা ঠিক নেই। ঊষা আর কথা বাড়ায়নি, সে ভাবল, এতটা জার্নির ধকলেই শরীর হয়তো খারাপ লাগছে। তিন বছর আগে হার্টের অপারেশনের পর থেকেই লোকটা দুর্বল হয়ে পড়েছে।
এদিকে অশেষ ম্যাডামের সাথে দেখা করে তার বাবার পৌঁছনোর কথা জানিয়েছিল। অশেষ লক্ষ্য করেছে, বাবার পৌঁছনোর সংবাদ পেয়েই তার ম্যাডামের মুখে একটা খুশির ঝলক বয়ে গিয়েছে।
ম্যাডাম, ল্যাবরেটরি তে অশেষ কে বলে যে কাল সকালে সে যেন তার বাবাকে নিয়ে আসে। কাল শনিবার, ছুটির দিন তারা একসাথে কাটাবে। ল্যাব থেকে ফিরে অশেষ তার বাবাকে জানায় যে আগামীকাল তাকে ম্যাডামের সাথে কাটাতে হবে আর তার মাকে বলে যে এখানকার ভারতীয় প্রৌঢ়রা কাল একটা গেট টুগেদার করছে, বাবা কালকে পুরো দিন রাত সেখানেই থাকবে। এই কথায় ঊষা খুশি হয় কারণ সে দেখছে লোকটা কয়েকদিন ধরে কেমন মনমরা হয়ে আছে। বাইরের কয়েকজনের সাথে গল্পগুজব করলে মনটা ভালো হবে।
ক্যালিফোর্নিয়ার ঠান্ডাতেও কৃশানুর কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমতে থাকে। রাতে ঘুম হয়না। কি করে সে ম্যাডামকে খুশি করবে ? হার্টের অপারেশনের পর থেকে সে তো ঊষাকেই সেভাবে আদর করতে পারেনি। ঊষা এই নিয়ে কতো মজাই করে। যদি ম্যাডাম কে সে খুশি করতে না পারে, অশেষের ক্ষতি হয়ে যাবে। কিন্তু এই বয়সে সেটা কিভাবে সম্ভব ? মাথার ভিতরটা কৃশানুর দপদপ করতে থাকে। সারারাত ঘুমাতে পারেনা।
পরদিন সকালে ছেলে অশেষের সাথে কৃশানু ম্যাডামের বাংলোয় উপস্থিত হয়। অশেষ কলিং বেল বাজাতেই ম্যাডাম থমাস নিজেই দরজা খুললেন। হাসিমুখে স্বাগত জানান কৃশানুকে আর অশেষকে বলেন — এবার তুমি যাও। কালকে সকালে এসে বাবাকে নিয়ে যেও। অশেষ ম্যাডামের দিকে তাকাতে পারেনা। রাগে আর ঘৃণায় সে জর্জরিত। মনে মনে অশেষ ম্যাডামকে ডাইনী বলে আর ভাবে, বিদেশিনীরা সত্যিই খুব খারাপ, এদের চরিত্রের কোনো ঠিক নেই।
ম্যাডাম কৃশানুকে তার ড্রয়িং রুমে এনে বসান। ড্রয়িং রুমে ঢুকেই কৃশানু চমকে যায়, সেখানে হাল্কা সুরে রবীন্দ্রসঙ্গীত বাজছে। কৃশানু কিছু বলার আগেই ম্যাডাম বলেন, আসলে কোলকাতায় থাকার সময় বাংলাকে ভালোবেসেছিলাম। আর বাংলাকে ভালোবাসলে ট্যাগোরকে বাদ দেওয়া যায়না। তবে এই বাংলা শিখতে আমার বান্ধবী মনিষা আমাকে অনেক সাহায্য করেছে। স্মিত হাসি জোর করেই হাসে কৃশানু। কৃশানু ভাবে, তাকে ভোলাতেই ম্যাডামের এসব আয়োজন। কিছুক্ষণের মধ্যেই একটা মেয়ে চা জলখাবার নিয়ে এলো। ম্যাডাম বললেন, খেয়ে নিতে। জলখাবার শেষ হতেই ম্যাডাম কৃশানুকে বললেন, আজকে আপনার সাথে যা কিছু ঘটবে তার পুরোটাই রেকর্ডিং হচ্ছে। ঘরের প্রতিটি কোনায় ক্যামেরা লাগানো আছে। এই রেকর্ডিং এর পুরোটাই অশেষকে দেবো। লাফিয়ে ওঠে কৃশানু। ম্যাডাম বললেন, আপনার নয় আমার প্রয়োজনেই অশেষকে দিতে হবে। কৃশানু মনে মনে ভাবে, বিদেশিনীরা এতো নির্লজ্জ ? কি করে বিবেকানন্দ নিবেদিতাকে বোন ভেবেছিল ? কৃশানুর মাথাটা দপদপ করছে। নানা কথা ম্যাডাম বলতে থাকেন আর কৃশানু অনিচ্ছা সত্ত্বেও উত্তর দেয়। এরপর ম্যাডাম বলেন, আমি আজকে নিজের হাতে আপনাকে রেঁধে খাওয়াবো। বাঙালি খাবার। মনে মনে হাসে কৃশানু আর ভাবে, এতো সস্তা বাঙালি খাবার বানানো ? ম্যাডাম রান্না করতে চলে গেলে কৃশানু হাঁফ ছেড়ে বাঁচে।
কখন যে চোখ দুটো লেগে এসেছিল কৃশানু তা বুঝতেই পারেনি। ম্যাডামের ডাকে জেগে ওঠে। ম্যাডাম কৃশানুকে সঙ্গে করে ডাইনিং হলে নিয়ে গেলেন। রান্নার পদ দেখে কৃশানুর চোখ ছানাবড়া। ডাল, আলু পোস্ত, বেগুন ভাজা, চিকেন , টমেটোর চাটনি। অবাক হয়ে কৃশানু খাবারের থালার দিকে তাকিয়ে থাকে। ম্যাডাম বলে যান, মনীষার থেকেই এসব শিখেছিলাম আর এখানে ইন্ডিয়ান স্টোরে সবকিছু পাওয়া যায়। রাতে প্রণ খাওয়াবো। কৃশানু মনে মনে ভাবে, লোক ভোলানোর ওস্তাদ। আমাকে ছাড়লেই বাঁচি আর প্রণ খাওয়াতে হবেনা। রান্নার স্বাদ খুবই ভালো লাগে কৃশানুর। কৃশানু ভাবে, মেয়েরা সত্যিই যাদু জানে।
খাওয়া শেষ হতেই ম্যাডাম কৃশানুকে নিজের বেডরুমে এনে বলেন, এখন বিশ্রাম করুন। আজকে সারারাত আমাকে যে সঙ্গ দিতে হবে। একথা বলেই ম্যাডাম মুচকি হেসে ঘর থেকে বেরিয়ে যান আর কৃশানুর মুখ থেকে বেরিয়ে আসে— হারামি মেয়েছেলে কোথাকার।
সন্ধ্যা লেগেছে। ঠান্ডা পড়েছে। কৃশানু হঠাৎ ভাবে, ব্যাপারটা কি ? ঘরে ঢুকতেই রবীন্দ্রসঙ্গীত, বাঙালি খাওয়া। আর ম্যাডামের পোশাক তো যথেষ্ট রুচিশীল। মনে মনে বলেন, সব মাকাল ফল। উপরে সুন্দর আর ভিতরে নোংরা।
দরজা খুলে ম্যাডাম ঘরে ঢোকেন এবং কৃশানুকে বলেন ফ্রেশ হয়ে নিতে। ঘড়ির কাঁটা প্রায় আটটার ঘরে। কৃশানু ফ্রেশ হয়ে এলে ম্যাডাম একটা প্যাকেট তার হাতে ধরিয়ে বলেন, যান এগুলো পরে আসুন। কৃশানু বলে, মানে ? ম্যাডাম বলেন, কথা বাড়াবেন না। ছেলের কথা ভেবে যা বলছি সেটা করুন ।
কৃশানু প্যাকেট খুলে দেখে তাতে ধুতি আর পাঞ্জাবি। কৃশানু ভাবে, কি খেলা খেলতে চাইছে ম্যাডাম তার সাথে ? উপায়ান্তর না দেখে কৃশানু ধুতি পাঞ্জাবি পরে বেডরুমে ঢুকে দেখে, ম্যাডাম শাড়ি পরে আসন পেতে বসে, সামনে প্রদীপ জ্বলছে, আর একটা প্লেটে চন্দন বাটা। অবাক হয়ে যায় কৃশানু এসব দেখে। ম্যাডাম কৃশানুর হাত ধরে টেনে বসিয়ে দেয় আর তারপর কৃশানুর দিকে তাকিয়েই অঝোরে কাঁদতে থাকেন। কৃশানু ম্যাডামের কান্না দেখে অপ্রস্তুত হয়ে যায়। কি হয়েছে আপনার ? আপনি কাঁদছেন কেন ?
ম্যাডাম বলে চলেন, অশেষের মোবাইলে যখনই আপনার ছবি দেখলাম তখনই আপনাকে দেখার জন্য আমি পাগল হয়ে গেলাম। আজ থেকে ত্রিশ বছর আগে মানে আমি তখন বছর পঁচিশের, কোলকাতায় থাকতাম। মনীষা ছিল আমার বান্ধবী। ওর জন্য আমি বাংলা ভাষাকে ভালোবেসে ফেলি। বাঙালির আচার অনুষ্ঠান আমাকে আকৃষ্ট করে। বিশেষ করে, ভাইফোঁটা। মনীষার ভাইকে আমি ফোঁটা দিতাম। আমার এক দাদা ছিল। সেই দাদাকে ফোঁটা দিতে মন চাইতো। দাদাকে আমার ইচ্ছার কথা জানালাম। দাদা তখন এই ক্যালিফোর্নিয়া ইউনিভার্সিটি তে প্রফেসর হিসাবে নতুন জয়েন করেছে। দাদা আমাকে খুব ভালোবাসতো। দাদা বলেছিল, কোলকাতায় এসে কোলকাতা ঘুরবে আর আমার থেকে ফোঁটা নেবে। কোলকাতায় আসার সময় প্লেন দুর্ঘটনায় দাদার মৃত্যু হয়। আমি কোলকাতা ছেড়ে এখানে চলে আসি। শুনেছিলাম, মানুষের মতো দেখতে মানুষ হয়। অশেষের মোবাইলে আপনার ছবি দেখেই যেন নিজের দাদাকে ফিরে পেলাম। ফোঁটা দেওয়ার লোভ সামলাতে পারলামনা। একটু চতুরতার আশ্রয় নিতে হলো আপনাকে এখানে আনার জন্য। তাই এখন আমি আপনাকে ফোঁটা দেবো। আমার ঘরের নিয়নের আলোয় আর পবিত্র প্রদীপের আলোয় আমাদের ভাই বোনের ভালোবাসা বাংলার ভাইফোঁটার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হোক।
কৃশানু কাঁদছে। কতো কতো নোংরা কথা সে ভেবেছে। আচ্ছা, গঙ্গা তে স্নান করলেও কি মনের এই নোংরা পরিষ্কার হবে ?
ম্যাডাম থমাস , দাদা কৃশানুকে ফোঁটা দিচ্ছে আর হাল্কা সুরে বাজছে, যমের দুয়ারে পড়ল কাঁটা। ম্যাডাম বললেন, দাদা তোমাকে রাতে কেন রেখেছি জানো ? আমি যখন এখানে আসতাম, দাদাকে সারারাত ঘুমাতে দিতাম না। খুব গল্প করতাম। তোমার সাথেও তাই করব। কৃশানুর নিজেকে খুব ছোট মনে হচ্ছে। এরপর সারারাত দুজনে নানা গল্প করে কাটিয়ে দেয়।
অশেষ সেইদিনের রেকর্ডিং দেখে সেও নিজেকে ছোট ভাবে। ম্যাডামের প্রতি শ্রদ্ধা বেড়ে যায়।
সব শুনে ঊষা হেসে অস্থির। কৃশানুকে সে বলে, মেয়েদের শুধু মেয়ে ভাবো মেয়েছেলে ভেবোনা।
কৃশানু করজোড়ে বলে, নারীই ঈশ্বর। আমার বোন থমাস নারীশ্বর।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

scroll to top