নোবেল সভার পথে – সুশান্ত কুমার ঘোষ | গল্প | আমার সাহিত্য

নোবেল সভার পথে

সুশান্ত কুমার ঘোষ


এক

আপনার তত্ত্ব নোবেল সভায় প্রবেশের ছাড়পত্র পেয়েছিল । কিন্তু চূড়ান্ত পর্বে ছিটকে গেল । অল্পের জন্য নোবেল আপনার হাত ছাড়া হল । কিন্তু আপনি হতাশ হলেন না । পেয়ে গেলেন দ্বিগুণ উৎসাহ ।কারণ আপনি স্বপ্নেও ভাবেননি আপনার কাজ কখনো নোবেল সভায় পৌঁছতে পারে । আত্ম প্রকাশেই এই বিরাট সাফল্যে আপনি উল্লসিত ।এক রোম্যান্টিক উত্তেজনায় আপনি অস্থির হয়ে উঠেছেন ।প্রবল উদ্দীপনায় আবার আপনি ঝাঁপিয়ে পরতে চাইছেন কাজে ।আপনি জানেন , তত্ত্বের  বাইরে আরও অজস্র তথ্য আপনার ল্যাপটপ বন্দী । ভাঙাচোরা পথ হেঁটে ,জল-কাদা মারিয়ে , খানাখন্দ ডিঙিয়ে , পৌষের সকালে , জ্যৈষ্ঠের দুপুরে গ্রাম বাংলার মাঠ ময়দান বন বাদাড় গলি ঘুপচি আটচালা – পরচালা ঘুরে কে বা কারা ওই সব তথ্য সংগ্রহ করেছে সে সব আপনি জানেন না । জানতেও চাননা । তার প্রয়োজনও নেই আপনার । আপনার প্রয়োজন তথ্যের । আর মাউসের একটা ক্লিকে নেটের পর্দায় সে সব আপনি পেয়েও গিয়েছেন । সেই তথ্যে তত্ত্ব বুনেই কিস্তিমাৎ ।সাদা কাগজে কালির আঁচর কাটা তথ্যগুলো যে এভাবে নোবেল সভায় আপনাকে পৌঁছে দেবে ,আপনি ভাবতেই পারেননি ।নিজের কাজে সবাই খুশি থাকে । আপনার খুশি মাত্রা ছাড়া । আপনি স্বপ্ন বিভোর ।ভাবছেন নোবেল আপনার হাতের মুঠোয় ।প্রাপ্তি কেবল সময়ের অপেক্ষা ।

দুনিয়া এখন দশ মিনিটের পথ । শান্তিনিকেতন দশ পলকের । শান্তিনিকেতনটা এই কারণেই প্রাসঙ্গিক, আপনি থিসিস পেপারটা ওখানে বসেই লিখতে চান । কারণ ওটা দুই নোবেল ম্যানের পীঠস্থান । তৃতীয় ব্যক্তি হিসেবে আপনি ওই স্থানটাকেই বেছে নিচ্ছেন ।আপনি ভাবছেন কাজ তো মোটে পল কয়েকের ।ঝাঁ চকচকে সড়ক পথে শাঁ করে চলে যাবেন শান্তিনিকেতন । শাল , মহুয়া ,পলাশ ঘেরা রাঙা মাটির দেশের কয়েকটা রুক্ষ দশার আঁচর মিশিয়ে ল্যাপটপের তথ্য দেবেন ঠেসে । তারপর চালাবেন ব্রাশ । নোবেল আপনার পাখির চোখ ।তাই ব্রাশটাই তুরুপের তাস ।পালিশের অভাবেই আগের থিসিসটার কপালে শিকে ছেড়েনি । এবার আপনি পালিশের ভুল করবেন না। এই পালিশের রঙটা খুঁজতেই আপনার সড়ক সফরের পরিকল্পনা ।

পিচ পিচ্ছিল সড়ক পথে দুরন্ত গতির ছুটন্ত চিতার পেটে বসে রঙিন কাঁচের ভিতর থেকে দুপাশে দুবার চোখ বোলাতে বোলাতেই পৌঁছে যাবেন শান্তিনিকেতন ।সেই এক পলকের চোখে দেখা সীমান্ত ঘেরা সবুজ গ্রাম , সোনালি ধানক্ষেত ,সড়ক পথের দুই ধারে রঙবেরঙের অট্টালিকা ,মোরাম ঢাকা পাথর বাঁধা গ্রাম সড়ক,দূরে দূরে ছবির মত গ্রাম , রাস্তার মোড়ে মোড়ে গঞ্জের রঙ । ফাস্টফুড থেকে মোবাইল শপ , দূরে ব্রহ্মডাঙ্গায় মোবাইল টাওয়ার , স্টপে স্টপে গাড়ির স্ট্যান্ড- চার পলকের নেত্রপাতেই পালিশের সব রঙই আপনি পেয়ে যাবেন ।শিরোনাম আপনি আগেই ঠিক করে ফেলেছেন । তথ্য , শিরোনাম ,  পালিশের রঙ সবই আপনার হাতের মুঠোয় ।কেবল সাদা কাগজে ছাপার হরফে ওগুলোকে সাজিয়ে তোলার কাজটাই বাকি ।অতএব নোবেল প্রাপ্তি সময়ের অপেক্ষা ।

দুই

আপনার জন্য সতর্ক বার্তা ছিল । ধীরে চলার সতর্ক বার্তা । কিন্তু উত্তেজনার আতিশয্য আপনাকে ভিতরে ভিতরে এতই অস্থির করে তুলেছে যে আপনি সতর্কতার কথা ভুলেই যাবেন । সুতরাং আপনি পিছল খাবেন । এর আগেও কয়েকবার পিছল খেয়েছে গাড়ি ।কিন্তু পালিশের রঙ খোঁজার তন্ময়তায় আপনি বুঝতে পারেননি ।সামান্য ঝাঁকুনিতে চেতনায় ফিরে আবার হারিয়ে গিয়েছেন পালিশ খোঁজার ভিড়ে । ছবির মত গ্রাম ,নানান রঙের দৃষ্টি নন্দন অট্টালিকা ,সবুজ ক্ষেত সোনালী ধানের  স্বপ্ন বিভোর আপনি কখন কুনুর পেরবেন বুঝতেই পারবেন না । কুনুর ছেড়ে অজয় ছোঁয়ার মাঝেই আপনি পিছলে পরবেন ।কেন পরবেন না বলুন তো! সাত সাতজন কিশোরী- যুবতীর রক্ত ! পাঁচ পাঁচটা দুরন্ত একুশের তরতাজা প্রাণ । আর পাঁচ হাজার নরনারীর চোখের জলে কিশোর গঞ্জের মাটি যে পিছল হয়ে গেছে । এই কিশোর গঞ্জে এসেই সড়ক থেকে ছিটকে যাবে আপনার গাড়ি ।পোড়া ছাইয়ের স্তূপ মাড়িয়ে গাড়ি এসে আটকে যাবে শিমুল গাছের গায়ে । শতাব্দী প্রাচীন বিরাট এক শিমুল ।ছাইয়ের স্তূপে গাড়ির গতি কমে যাওয়ায় আপনার কোন ক্ষতি হবে না ।আপনার সামনে দিগন্ত জোড়া সোনা ঝলমল ধানক্ষেত । আপনার বাম দিকে কাজল কালো জল টলমল ঢেউ খেলানো দিঘী ।

আপনি নেমে আসবেন গাড়ি থেকে ।বামদিকে আধপোড়া চাল কাঠ ,জল পচা খর লেপটে থাকায় ডান হাতি গেটটাই খুলবেন ।আপনার পা দুটো অবশ্য ঘরপোড়া কালো ছাইয়ের স্তূপে ডুবেই যাবে । আপনার পালিশ খোজা চোখ দুটোর ধাতস্থ হতে একটু সময় লাগবে । ভূমি সংস্কারের সড়ক ধরে দ্রুত বদলে যেতে থাকা সমাজটার বাহ্যিক চাকচিক্যের প্রতি আপনি এতদিন এমনই বিভোর ছিলেন যে এই আকস্মিক ছন্দ পতনে আপনি দিশা হারাবেন ।আপনি এতদিন ছাইয়ের স্তূপে দূর্বা গজাতে  দেখেছেন । এখন সেই দূর্বার পোড়া ছাইকে আপনি বিশ্বাস করতে পারবেন না ।

ধীরে ধীরে সরে যাবে পর্দা । তীব্র তীক্ষ্ণ অন্তর্দৃষ্টির আলোয় আপনার সামনে উদ্ভাসিত হবে কর্কট লাঞ্ছিত পূর্তিগন্ধময় রুধিরাক্ত বর্তমান । আপনি দেখবেন রক্তমাখা ছুড়ি , কার্তুজের খোল ,তরুণের তাজা হৃৎপিণ্ড , কিশোরীর ক্ষত বিক্ষত শরীর , যুবতীর অগ্নিদগ্ধ দেহাবশেষ । আপনি দেখবেন বাক্সবন্দী রক্তমাখা দলিল । দলিল থেকে ঠিকরে বেরচ্ছে বুলেটের দোর্দণ্ড প্রতাপ ।  প্রতাপের তীব্রতায় হস্তাক্ষর থরথর করে কাঁপছে !

আপনি আর এগোতে পারবেন না ।চারপাশ এসে জড়িয়ে ধরবে আপনার পা । আপনি লোকজন খুঁজবেন । কিন্তু একটা লোকও আপনি দেখতে পাবেন না । আপনি দাঁড়িয়ে আছেন জাতীয় সড়কের পাশেই । এ সড়ক কখনো বন্ধ থাকে না । সড়ক বেয়ে কাতারে কাতারে গাড়ি ছুটছে সাঁই সাঁই করে । তাদের কেউ আপনাকে দেখতে পাবেনা । কারণ ওদের কারোরই আপনার মত  চোখ , কান , নাক কিছুই নেই । এই কিছুক্ষণ আগেও আপনি যেমন ছিলেন আর কি ।তাই আপনি ডাকলেও ওরা কেউ শুনবেনা । হাত নাড়লেও দেখবেনা । বাতাসে গন্ধ ছড়ালেও ওদের নাকে ঢুকবেনা ।

তিন

শিমুল তলায় রাত আসবে । জ্বলে উঠবে বিজলি বাতি । মোবাইল টাওয়ারের লালবাতি আকাশে জ্বালবে সন্ধ্যা প্রদীপ । আলোক মালায় সেজে উঠবে কনফেকসনারী শপ । ঠাণ্ডা পানীয়ের ফোয়ারা , বিলিতি মদের তুফান , তরুণদের উল্লাস , তরুণীদের লাস্যে শিমুল তলা জম জমাট হয়ে উঠবে । কিন্তু আশ্চর্য ! আপনি একটাও লোক খুঁজে পাবেননা ! মধুর সন্ধ্যা মিশে যাবে গভীর রাতে । এক সময় স্তিমিত হবে উৎসব । চারপাশ নিঝুম হয়ে যাবে । ওরা এই মহেন্দ্রক্ষনের  অপেক্ষাতেই ছিল । ওরা মানে ছড়িয়ে থাকা ধান , রক্তমাখা ছুড়ি , ঘরপোড়া ছাই , দল পাকানো শরীর , কর্তিত স্তন , ক্ষতবিক্ষত যোনি ।  অবগুণ্ঠনের আড়াল সরিয়ে ওরা সবাই একে একে দুগ্ধপোষ্য শিশুর মত হামা টেনে আপনার কোলে এসে বসবে । এবং আশ্চর্য ,আপনিও ল্যাপটপ সরিয়ে ওদের সবাইকে কোলে বসাবেন । অগ্রজদের সাফল্য দেখে পিছনে অজস্র অপার সত্য শিশু আপনার কোলের দিকে ছুটে আসবে । আপনার কোল ততক্ষণে ভুবন বিস্তৃত হয়ে গেছে । ওদের স্থান সঙ্কুলানের কোন সমস্যা তাই থাকবেনা । ওরা সবাই কুন্দ-কলির মত দাঁত , কচি কচি নরম হাতে আপনাকে আদর করবে । ওদের আদরের ভাষায় আপনি পেয়ে যাবেন ওদের অন্তর মহল ।

আপনি দেখছেন যুগের আয়ুধ । শক্তির সঙ্গে কৌশলের নিপুণ মিশ্রণ এযুগের সেরা আয়ুধ । সংস্কারের পরশ মনির ছোঁয়ায় যে  মানব সমাজ অতিদ্রুত আলোর পথে পাড়ি দিচ্ছিল , সেই সংস্কৃত মানব সমাজ আধুনিক আয়ুধের ছোঁয়ায় কড়ি , কলম , বারুদ বোমার স্তর পেরিয়ে পৌঁছে যাচ্ছে আদিম অরণ্যের গিরি কন্দরের দিকে । বিভাজন নীতির নিপুণ ব্যবহার আপনাকে বিস্মিত করবে । নিউটন বা আইনস্টাইনের থেকেও এই সব মস্তিষ্কের ক্রিয়াশীলতা যে বহুগুণ বেশি , আপনি তৎক্ষণাৎ তা স্বীকার করবেন ।শ্রেণি সংগ্রামের তত্ত্ব আপনি পড়েছেন ।শ্রেণি বিভক্ত সমাজ আপনি দেখেছেন । আপনি ওখানেই লালিত ।কিন্তু সম শ্রেণির এমন নিপুণ বিভাজন আপনি ইতিহাসে কোথাও দেখেন নি । এমন কি ব্রিটিশদের ভারত কৌশলেও নয় । তাই আপনার ল্যাপটপে এসব নাই । এখানে বিভাজন কেবল দলের সঙ্গে দলের নয় । গোষ্ঠীর সঙ্গে গোষ্ঠীর । এখানে বিভাজন গ্রামে গ্রামে , পাড়ায় পাড়ায় , জ্ঞাতিতে জ্ঞাতিতে , সম্প্রদায়ে সম্প্রদায়ে , ঘরে ঘরে , ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে । দলপতির হুকুম এখানে শিরোধার্য । নবান্ন, গাজন , ইফতার, ঈদ , চা চক্র তো অনেক পরে, বোনের বিয়েতে ভাইয়ের যাওয়াও বারণ !

আপনি দেখেছেন বাংলার ঘরে ঘরে নবান্নের উৎসব । দেখেছেন ,ঈদ গাজন । শারদোৎসব থেকে ব্রতকথা , অন্নপ্রাশন থেকে শ্রাদ্ধ বাসর , সবাই খেয়ে গিয়েছে সবার ঘরে পাতা পেরে ।  ও পাড়ার মেয়েরা এসে আমোদ করে গেছে এ মহল্লার গ্রামতুতো ননদের বিয়েতে । সে সবের দিন এখন শেষ । বিভাজন নীতির নিপুণ প্রয়োগ কুশলতায় ভাই এখন ভাইয়ের চোখে কেউটে । অতএব অহি নকুলের যা পরিণতি হওয়ার কথা ,ঘটে তাই । আগে উৎসবের দিন কেবল মানুষ নয়, বউ ঝিদের হাঁকডাকে  পশুপক্ষীরাও খেয়ে যেত উচ্ছিষ্ট । এখন  বেড়াল কুকুরেরও পড়শির চৌকাঠ ডিঙনো মানা ।ভিন্ন পন্থীর জুটছে না কলের জল । ভিন্ন বাদীর ছেলেমেয়েরা যেতে পারবেনা স্কুল । কুলি কামিন ওদের জন্য নয় । ভিন্ন পন্থী । অতএব ভিন্ন গ্রহের জীব । এই সমাজের কোনও কিছুই ওদের জন্য নয় ।

 চার

আপনার কোলে তাজা হৃৎপিণ্ডটা হঠাৎ লাফিয়ে উঠবে । ও তরুণ , তরুণ কর্মকার । লক্ষাধিক হৃৎপিণ্ড নিহিত আছে ওর মধ্যে । ও ইস্কুল পাশ । কলেজ পাশ । বিশ্ব বিদ্যালয় পাশ । চাকরির পরীক্ষাতেও পাশ । দাবি উঠল পাঁচ লাখ । ওতে ফেল করল তরুণ । মোড়ল বাড়ির বিক্রম । বয়সে তরুণের চেয়ে অনেক বড় । দু’বারে মাধ্যমিক । হোঁচট খেতে খেতে উচ্চমাধ্যমিক । রকমারি চেষ্টায় বি এ পাশটা হল । চাকরির পরীক্ষায় কেবল নাম আর রোল নাম্বার লিখে খাতা জমা দিয়ে হাসতে হাসতে বেড়িয়ে এসেছিল হল থেকে । সবার আগে সেই বিক্রমই পেল নিয়োগ পত্র ।  তরুণরা সঙ্ঘবদ্ধ হচ্ছিল । আন্দোলনে যাওয়ার কথা ভাবছিল । ভাবছিল আইনের সাহায্য নেওয়ার কথা ।একদিন শিমুল তলার ঝোপের পাশে পরে থাকতে দেখা গেল তরুণের লাশ !

হৃৎপিণ্ড থেমে যাবে । কেঁদে উঠবে কিশোরী । ক্ষত বিক্ষত যোনির যন্ত্রণায় তার আর্তরবও আটকে যাবে কণ্ঠে । একটা অস্ফুট গোঙানির শব্দ ভেসে আসবে আপনার কানে । মেয়েটি অবেলার দিকে ছাগল খুঁজতে মাঠের দিকে গিয়েছিল ।আর ফেরেনি । সারারাত খোঁজাখুঁজির পর তার বাবা সকালে থানায় আসে মেয়ের নিখোঁজের ডাইরি লেখাতে । অতি সক্রিয় পুলিশ প্রশাসন স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে খুন ও প্রমাণ লোপাটের অপরাধে মেয়ের বাবাকেই গ্রেফতার করে । দুপুরের দিকে মেয়েটার কুকুর খোবলানো লাশ কুকুরের সৌজন্যেই পাওয়া যায় । পুলিশ ভ্যান প্রস্তুতই ছিল । সংবাদ মাধ্যমকে টেক্কা দিয়ে লাশ তুলে চম্পট  দেয় পুলিশ । বিকেলে ছুটে আসে সংবাদ মাধ্যম । অবরোধ ভেঙ্গে ভিতরে প্রবেশের পথ তারা পাবেনা ।যারা একটু ডানপিটে গোছের , তারা ফাঁকফোকর গলে প্রবেশ করতে গেলে রড লাঠির আঘাতে ক্যামেরা হবে সাত টুকরো । মাথা হবে চৌচির । তিনমাস কাটবে হাসপাতালের বিছানায় ।এতকিছুর পরেও সংবাদ মাধ্যমকে দমিয়ে রাখা যাবেনা । সংবাদ মাধ্যমের একটা অংশের চাপেই পুলিশ মেয়েটির বাবাকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হবে । তবে পুলিশ লকআপের শূন্যস্থান আর পূরণ হবেনা । কারণ পুলিশ অপরাধীদের খুঁজেই পাবেনা । দাদাদের ক্লাবে ঢোকার হিম্মৎ কার আছে !

কিশোরী কণ্ঠ তলিয়ে যাবে ধীরে ধীরে । কথা বলবে রক্ত । কথা বলবে ক্যামেরার ভাঙা কাঁচ । সাংবাদিকদের চাপ চাপ রক্ত আর ক্যামেরার ভাঙা কাঁচ আপনার কোলে ।রাজ শক্তির চণ্ড প্রতাপের খণ্ড খণ্ড চিত্র তার প্রকোষ্ঠে প্রকোষ্ঠে । প্রতাপের কিছুটা আপনার জানা ।আপনার ল্যাপটপে আছে । কিন্তু সে সবই পালিশ করা । ওরাই আপনাকে দেখাচ্ছে পালিশ বিহীন  নির্ভেজাল হালচাল ।

পাঁচ

ঘরপোড়া ছাই আপনার কোল থেকে উঠে আসবে চোখে । চোখ দুটো গুল গুল করবে । চুলকানি থামাতে চোখ দুটো রগরে দেবেন । আর তাতেই সব পর্দা খুলে যাবে । আপনার সামনে ভেসে উঠবে একের পর এক দৃশ্য । সামনে দেখবেন বিরাট এক  অট্টালিকা । উঁচু পাঁচিল দিয়ে ঘেরা চারপাশ । অট্টালিকাটা দেখে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের কথাই মনে পরবে আপনার । উদয় পুরের রাজপ্রাসাদও মনের কোনে উঁকি দিয়ে যাবে একবার । ছাই আপনার ভুল ভাঙাবে । যা ভাবছিলেন সে সবের কিছুই নয় ।ছাইয়ের কাছেই শুনবেন এই সেই বিখ্যাত গায়েন বাড়ি ।  এই বাড়িরই মালিক দীনবন্ধু গায়েন ।

কিছুকাল আগের একটা অস্পষ্ট ছবি আপনার চোখের সামনে ভেসে উঠবে । তখন এটা জাতীয় সড়কের মর্যাদা পায়নি । ভাঙ্গা চোরা বোল্ডার বিছানো এই পথ ধরেই আপনি বাবা মায়ের সঙ্গে শান্তিনিকেতন এসেছিলেন । কিশোর কালের স্মৃতি সহজে কেউ ভোলে না । আপনিও ভোলেননি । আপনাদের গাড়িটা তখন এখানেই দাঁড়িয়েছিল । আপনার বাবা মা চা পান করেছিলেন । আপনি খাবার মত কিছুই পাননি । ঠাণ্ডা পানীয় তো দুরের কথা , কেক চকোলেট ও না । একরাশ মন খারাপ নিয়ে আপনি আশপাশ দেখছিলেন । তখনই একটা মুদির দোকান আপনার চোখে পরেছিল ।সেখানেও পাউরুটি লে-রুয়া আর লজেঞ্চুস ছাড়া আর কিছুই ছিলনা । রাগ দেখিয়ে সেখান থেকে ছিটকে আপনি চলে গিয়েছিলেন পিছন দিকে ।সেখানে আটচালা পরচালা ওয়ালা একটা ঘিঞ্জি গ্রাম্য বস্তি আপনার চোখে পরেছিল । এপাশে ওপাশে কিছু ডাঙা ডহর । তারপরেই দিগন্ত বিস্তৃত কৃষি জমি । সেই আকাশ ছোঁয়া সবুজের সমারোহ আপনাকে মুগ্ধ করেছিল । সেদিন আপনার প্রাপ্তি ওই টুকুই । স্মৃতি আপনার সঙ্গে বিশ্বাস ঘাতকতা করবেনা । আপনি এক লহমায় চিনে নেবেন সেদিনের সেই মুদির দোকানদার দীনবন্ধু গায়েনই আজকের গায়েন এস্টেটের অধীশ্বর ।

কয়েক শ’ টাকার মুদিখানার মালিক কয়েক বছরে কয়েক হাজার কোটি টাকার মালিক হলেন কেমন করে , এবার সেই ইতিহাস প্রত্যক্ষ করবেন আপনি ! প্রাসাদে কক্ষের আর শেষ নাই । আকাশ পুরী , পাতাল পুরী ,মর্ত্য পুরী , স্বর্গদ্বার , নন্দন   কানন মায়াবন অশোক কানন থেকে দণ্ডকারণ্য – সবই এখানে আছে । কক্ষে কক্ষে সিন্দুক, সিন্দুকে সিন্দুকে দলিল দস্তাবেজ থেকে ভোটার আই ডি , রেশন কার্ড , আধার কার্ড  সব তালাবন্দী । সাংবাদিকের রক্ত কিংবা ক্যামেরার ভাঙা কাঁচ আপনাকে এই রহস্যের সুলুক সন্ধান দিতে পারবেনা ।এ রহস্যের সালতামামির হদিশ দেবে ঘর পোড়া ছাই ।

ভূমি সংস্কারের তথ্য আপনি জানেন । সেটা আপনি প্রত্যক্ষও করেছেন । কারণ তখন আপনি জন্মে গেছেন ।আপনার জন্ম কিন্তু গ্রামের মাটিতে ।এক নিস্তরঙ্গ গ্রামের যৌথ পরিবারে জন্ম আপনার ।জীবনের অভিজ্ঞতায় আপনি দেখেছেন সেদিনের  যৌথ পরিবার আজ ভেঙ্গে গিয়েছে পরমাণুতে । আপনার দাদুর বিশ বিঘা জমির এখন সাতটা সরিক । আপনি এখন শহর বাসী চাকরি জীবী হলেও সেই বিশ বিঘা জমিই পাঁচটা পরিবারের ভরসা । সম্পত্তি ভাগ হয়েছে সাতভাগে । সদস্য বেড়েছে আটগুণ । সুতরাং উৎপাদন যদি আটগুণ না বাড়ে প্রাণ কটা বাঁচবে কেমন করে!

সংস্কারের সুবাদে হাজার হাজার জমির পাট্টা গিয়েছে ভূমিহীনদের হাতে ।আপনার মাটিতে কৃষি বিপ্লবও এসেছে সেচ সার বীজ আর আধুনিক যন্ত্রপাতির হাত ধরে । সাতগুণ ফসল তুলবেন , আর কৃষিতে বিনিয়োগ বাড়াবেন না তাই কখনো হয় ! ব্যয় এখানে অগ্রিম । আগে টাকা ঢালো পরে ফসল তোলো । খরা মারি বান বন্যা হল তো সবটাই গেল জলে । মুদিখানার মালিক দীনবন্ধু গায়েন এই সুযোগটা কাজে লাগিয়েছিল নিখুঁত ভাবে । চাষের সময় কৃষকদের সার বীজ দাদন দিয়ে ফসল তোলার সময় দ্বিগুণ মূল্য ঘরে তোলে । শুনেই আপনি গর্জে উঠবেন । কারণ কৃষক ও কৃষি সুরক্ষার অনেক কৃষক বান্ধব সরকারী প্রকল্পের তথ্য আপনার ল্যাপটপে আছে । ধমকের সুরে বলবেন ‘ গর্ধব কোথাকার ! এত সহজ শর্তে কৃষি ঋণ দিচ্ছে ব্যঙ্কগুল । কত মিনি-কিট , সার গাছের চারা …………… আরও কত কি আছে ওদের জন্য ! সরকারি সমস্ত প্রকল্প তো ওদের জন্যই । কত অনুদান সেখানে। ওরা সেখানে যায়না কেন?” ল্যাপটপের তথ্যের উপর দাঁড়িয়ে কথাটা আপনি যত সহজে বলবেন , বিষয়টা কিন্তু ততটা সহজ নয় । শরিকানী জটিলতায় দলিল দস্তাবেজের সমস্যা তো আছেই ।এ সব ক্ষেত্রে  ব্যাঙ্কগুলোর বছর ও কিন্তু ছত্রিশ মাসে । ব্যাঙ্ক থেকে বীজ বোনার টাকা হাতে পেতে ফসল তোলার সময় পেরিয়ে যাবে ।দালাল ধরে ওদিকটা যদিবা ম্যানেজ হয় , সমস্যা অন্য জায়গায় । সেটাই গভীর এবং গুরুতর । কারণ দীনবন্ধু গায়েন একটা মুদি খানার মালিক হতে পারে, মাথাটা তার মোটেই কাঁচা নয় ।তার কুশলতার পরিচয় পেলে শাইলকও লজ্জা পাবে ।

অসময়ে দীনবন্ধু অভাবীদের বীজের প্যাকেট , সারের বস্তা দিয়েছেন বটে , তবে বাম হাতে বুঝে নিয়েছেন জমির দলিল , স্ত্রীর গয়না ।ঋণ পরিশোধের পর কৃষকরা তা ফিরেও পেয়েছে । এই ভাবেই বিশ্বস্ততার প্রতীক হয়ে ওঠে দীনবন্ধু গায়েন । আর সেই প্রতীকে ভর করেই একের পর এক বাজি জিততে থাকে ।খরা মারি , বান বন্যা তো আছেই । মেয়ের বিয়ে ,ছেলের পড়াশুনা , বাপ মায়ের অসুখে ভরসা সেই দীনবন্ধু গায়েন ।গ্রামের পর গ্রামের প্রান্তিক কৃষক পরিবারের যৎ সামান্য গয়না গাঁটি তাই দীনবন্ধুর সিন্দুকে । জমির ফসলও অর্ধেক যায় তার ঘরে । দলিল যে তার সিন্দুক বন্দী ! কৃষক ব্যাঙ্কের দরজায় যাবে কি নিয়ে ! পাট্টার দলিলও জমা পরল দীনুর হাতে । জমি চষল দীনুর লাঙ্গল ।

ছয়

এই পর্যন্ত এসেই আপনি চমকে উঠলেন । সাংবাদিকের কলম কিম্বা ক্যামেরা আপনাকে এ তথ্য দিতে পারবেনা । তাই ছাইয়ের প্রতি ভরসা আপনার দ্বিগুণ হবে । এই সফরে সেই আপনার প্রধান পথ প্রদর্শক । রাজদণ্ড দুর্বলের হাতে ধরা দেয়না   । আপন কারিশমায় সফল দীনবন্ধুর হাতে রাজদণ্ড আপনি এসে ধরা দেবে । আপনি খুঁজবেন পুরনো সেই পল্লীটা । বাঁশ , খর তালপাতা ছাওয়া ছোটো কুঁড়ে ভরা যে ঘিঞ্জি পল্লীটা আপনি দেখে গিয়েছিলেন । তার চিহ্নও কোথাও নাই ।ওখানটাতেই এখন দীনবন্ধুর প্রাসাদ । সেই পল্লীর কয়েকজন বাসিন্দাকে আপনি দীনবন্ধুর ব্যারিকেডে দেখতে পাবেন । বাকিদের হদিশ আপনাকে কেউ দিতে পারবে না ! ল্যাপটপ এসব তথ্য রাখেনা ! কলম , ক্যামেরা , ছাই থেকে আপনার কোলে কিলবিল করা ওই সব অশ্রু রক্ত কলিজার অধিকারীর দল – কেউ না , কেউ না !

আপনি এখন দীনবন্ধু ভবনের পাতাল পুরীতে । ওটা অস্ত্রাগার । বোমা বারুদের উগ্র ঝাঁঝের মধ্যেও একটা উৎকট গন্ধ আপনার নাকে আসবে ! গন্ধের পথ ধরে আপনি পৌঁছে যাবেন উৎসে । পাতাল পুরীর অন্দরেও যে গুপ্ত কক্ষ থাকতে পারে , আপনি স্বপ্নেও ভাবেননি । কিন্তু স্বপ্ন নয় । জীবন্ত দুই চোখে প্রত্যক্ষ করছেন কঙ্কাল ঘর ! পাতাল পুরীর গুপ্ত কক্ষে নর কঙ্কাল  ! আপনি নয়ডার কথা কাগজে পড়েছেন । দেখেননি কখনো । দীনবন্ধুর পাতাল পুরীতে সেটাই আপনি প্রত্যক্ষ করবেন !

পাতাল ঘরের কায়া কঙ্কাল আপনাকে নিয়ে যাবে স্বর্গদ্বারে । ওটাই দীনবন্ধুর হারেম ! সেখানে প্রবেশ করেই চারপাশে একটা চাপা আর্তনাদ অনুভব করবেন । কিশোরীর কান্না , যুবতীর আর্তনাদ , কুলবধুর হাহাকারে আপনি দিশে হারা হয়ে পরবেন । রক্তস্নাত ,ক্ষতবিক্ষত এক কিশোরী আপনাকে পথ দেখাবে । সে উঠে আসবে আপনার চোখে । ওখানেই ওর নথ ভাঙা হয়েছিল ।ঋণগ্রস্ত বাবার মৃত্যুর পর মায়ের শরীরও বাবাকে ঋণ মুক্ত করতে পারেনি । দীনুর হারেমে তলব পরেছিল তার । দীনুর লালসা মেটাতে মেটাতে কিশোরী শরীর যুবতী হল । একদিন নিজের শরীরের প্রতিই ঘৃণা জন্মাল তার । এক সকালে পুকুর পাড়ে বাবলা গাছে ঝুলতে দেখা গেল তার নিথর দেহ । অবশিষ্টদের কথা আপনি আর জানতে চাইবেন না।  আপনি দুর্বল হয়ে পরবেন । কঙ্কাল আপনাকে নিয়ে আসবে দীনবন্ধুর প্রধান করনে । ওখানেই আপনি খুঁজে পাবেন বাক্সবন্দী দলিলের ইতিহাস । কাঁপা হস্তাক্ষরের নেপথ্য কাহিনী । দলিলে স্বাক্ষর করে প্রাণ হয়তো বেঁচেছে । কিন্তু কপালে পিস্তলের নল থাকলে কোন হাত না কাঁপবে !

সংস্কৃত ভূমির গুহা প্রবেশের ইতিহাস আপনি পেলেন । সচিত্র ভোটার আই ডি-র ইতিহাসও আপনি ওখানেই পেয়ে যাবেন  ।দীনবন্ধু তল্লাটের লোক সাধারণকে ডান হাতে দিচ্ছেন জব কার্ড , বাম হাতে নিচ্ছেন ভোটার কার্ড । যারা ওটা দিতে অস্বীকার করবে , জব কার্ড তাদের বরাতে জুটবেনা । প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কাজ কেউ পাবেনা ।আবার কাজ যেটুকু পাবে বরাদ্দ পারিশ্রমিকের সবটা পাবেনা । তবে ওদের কাজে আপনি অবশ্য খুশি হতে পারেননি ।আগের থিসিসেই তথ্য পরিসংখ্যান সহ আপনার অসন্তোষ ব্যক্ত করেছেন ।  আপনি উৎপাদনের মানদণ্ডে মজুরি প্রদানে বিশ্বাসী । বিনিয়োগ যদি কাঙ্ক্ষিত উৎপাদনে ব্যর্থ হয় , রাজকোষ একদিন শূন্য হবেই ।কেবল রাষ্ট্রের দায়িত্ব নয় , নাগরিকদের দায়বদ্ধতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ । একশ শতাংশ ব্যয়ে দশ শতাংশ কাজ পাওয়াকে আপনার মস্ত বড় ফাঁকি বলেই মনে হয়েছে । প্রকল্পটির বিভিন্ন স্তরের গলদ দেশের অর্থনীতির বুনিয়াদকেই দুর্বল করছে । বিপুল ব্যায়ে সামান্য উৎপাদন আপনাকে ব্যথিত করেছে ।

আপনি মে দিবসকে কুর্নিশ করেন । কিন্তু আবার একটি জুন দিবসের প্রত্যাশা করবেন ।ব্যক্তি মালিকানাধীন সংস্থায় শ্রমিক শোষণের বিরুদ্ধে আপনি যুদ্ধ ঘোষণা করবেন ।শ্রম অনুপাতে মজুরি ,বে-লাগাম কর্ম সময়ের পরিধিকে আপনি আট ঘণ্টার   বৃত্তে বাঁধার মরিয়া চেষ্টা চালাবেন । ঠিক তেমনি বিভিন্ন রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থায় ভেঙে পরা কর্ম সংস্কৃতি পুনর্নির্মাণের প্রচেষ্টায় সোচ্চার হবেন ।আট ঘণ্টার বৃত্ত ভাঙতে ভাঙতে ক্ষেত্র বিশেষে শূন্য ঘণ্টায় পৌঁছে যাওয়া , ওভার টাইমের পুষ্পবৃষ্টি , গরহাজিরার মহোৎসব আপনাকে ভাবিয়ে তুলবে ।তাই কর্ম-সংস্কৃতির পুনর্নির্মাণই আপনার কাছে বড় চ্যালেঞ্জ ।

সাত  

ভোটার আই ডি সিন্দুক বন্দী করে ব্যালট বাক্স ভর্তির পথ নিশ্চিত করেছে দীনবন্ধুরা । ষোলকলা তাতেও পূর্ণ হয়না ।এত কিছুর পরেও- ‘ প্রাণ দেব তবু ময়দান ছাড়বনা’ গোছের কিছু বেয়ারা থেকে যায় । ময়দান তারা ছাড়ে না বটে , তবে প্রাণটা ছাড়তে হয় । ঘরপোড়া ছাই এই কথাটা বলার জন্যই লেপটে আছে আপনার অঙ্গে । হুমকি অবরোধের পরেও ভোটের দিন বুথে যাওয়ার হিসাব চোকাতে হয় ।পুলিশ মিলেটরীর ঘেরা টোপে বুক ফুলিয়ে বুথ থেকে বেড়িয়ে এলেও বুকের স্পন্দন বেশি দিন স্থায়ী হয়না । দু একদিনের মধ্যেই পুড়ে ছাই হয় ওদের ঘর বাড়ি । ঘরামিদের আর হদিশ পাওয়া যায়না ।

আপনি জানতে চাইবেন এসব করে কারা ? ছাই আপনাকে একটা পাথর দেখাবে । হ্যাঁ , পাথর ! ছ’ ছটা পুত্রকে হারিয়ে  সালামত পাথরই হয়ে গিয়েছিল । দুই পুত্রের হদিশ নাই । এক পুত্র ফাঁসির দিন গুনছে গারদ ঘরে । একজনের পচাগলা দেহ বালির চর থেকে উদ্ধার হয়েছিল নিখোঁজ হওয়ার একমাস পরে । বাকি দুজন বেঁচেই আছে , তবে কোথায় সালামত জানেনা। এই সালামতই আপনাকে নিয়ে যাবে গ্রামের পর গ্রামে , মহল্লার পর মহল্লায় ।আপনি দেখবেন ঝুপড়ির পর ঝুপড়িতে  পঙ্গপালের  মত গিজগিজ করছে এক বছর থেকে বার বছরের কঙ্কালসার ধূলি লাঞ্ছিত উলঙ্গ প্রায় ছেলেমেয়ে । এক এক জনের তিন মহল্লায় তিন চারটি করে বউ । একজনের গড়পড়তা চোদ্দ পনেরটি করে সন্তান ।কিন্তু ভূমির পরিমাণ শূন্য । রোজকারের পথ দিন মজুরি । ক্ষিধে , অশিক্ষা , কুসংস্কার , রোগ ব্যাধি জেঁকে বসেছে তল্লাট জুড়ে ।

আপনি আগের থিসিসেই সর্ব-শিক্ষা ও সর্ব-স্বাস্থ্য অভিযানের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন । এখানে সে সবের চিহ্ন পাবেন না ।অঙ্গনয়ারির ঘর আছে , কর্মী নেই । স্বাস্থ্য কেন্দ্র মিলবে , স্বাস্থ্য কর্মী দেখবেন না । স্কুল প্রঙ্গনে কলের ছড়াছড়ি । জল  পাবেননা এক ফোঁটাও । কেবল খিস্তি খেউর লাঠালাঠি আর গোলা বারুদের গন্ধ । এই করতে করতেই ওরা একদিন ওস্তাদ হয়ে উঠবে ।শিক্ষা , সংস্কার , মায়া মমতা , ভালবাসার স্পর্শ ওরা কোনোদিন পায়নি ।তাই কালক্রমে ওরাই এক একটা  মানব বোমা তৈরি হয়ে উঠবে । প্রাণ নেওয়া এবং প্রাণ দেওয়া দুটোতেই সমান দক্ষ । সালামতের ছয় পুত্রের মত এমন হাজার হাজার পিতার পুত্র এক একটা মানব বোমা হয়ে মজুত হয়েছে দীনবন্ধুদের ব্যারিকেডে ।

আপনি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছেন ভেড়ির জল কাদের রক্তে লাল !কাদের রক্তে ভেসে যাচ্ছে নদীর বালি ! কাদের রক্তে রাঙ্গা হচ্ছে সিন্ডিকেটের ইট ।পাহাড় পর্বত অরণ্য নদী উপজাতি অধ্যুষিত ডুয়ার্স বা ছোটো নাগ পুর নয় । আপনি আছেন বর্ধিষ্ণু রাঢ়ের অভ্যন্তরে ।চাকচিক্য পালিশের আস্তরণ উন্মোচন করে তার অভ্যন্তরের প্রকৃত চিত্র প্রত্যক্ষ করে আপনি স্তম্ভিত হবেন । আপনার ল্যাপটপ বন্দী তথ্য রাশির সঙ্গে এর কোনো সাদৃশ্যই খুঁজে পাবেন না ।তবে একটি তত্ত্ব আপনি আবিষ্কার করবেন ।গণতন্ত্রের অন্ধকার দিকটি আপনি দেখবেন । অনাহার , অশিক্ষা , কুসংস্কারের অন্ধকারে আপনি আবিষ্কার করবেন ক্ষমতা লোভী ,সুবিধাবাদী ,  অর্থ-গৃধ্নু রাজনীতির স্বর্গরাজ্যটিকে।

দারিদ্র , ক্ষুধা , অশিক্ষা , কুসংস্কার এবং সরলতা –এই পঞ্চ স্তম্ভে নির্মিত রাজনীতির স্বর্গোদ্যানে প্রবেশ করেই আপনি সব প্রশ্নের উত্তর পেয়ে যাবেন ।শিক্ষা নাই , স্বাস্থ্য নাই , খাদ্য নাই, কর্ম নাই – কেবল রাজনীতি আছে । সংখ্যালঘু এবং অনগ্রসর ,এ দুটি-ই এখন তুরুপের তাস । আর স্তম্ভ পঞ্চ এখন দাবার ঘুঁটি ।

আপনি চলতে চলতেই দেখতে পাবেন চণ্ডী মণ্ডপ , শিব মন্দির , হরিসভা ,পীরতলা , ঈদ দরগা । ঈদ দরগায় এসেই আপনি থমকে দাঁড়াবেন ! সেখানে নামাজীদের পিছনে চেয়ারে বসে পাহারা দিচ্ছে দীনবন্ধুর ব্যারিকেড । অতঃপর  রামমন্দির , চার্চ , গুরু-দুয়ার ,যেখানেই যাবেন একই দৃশ্য দেখবেন । কেবল পাহারাদারদের চাদরের রংগুলোই যা আলাদা । যার জোর যেখানে , সে ঘেরে তার গড় । আপনি সহজ বুদ্ধিতে খুঁজেই পাবেন না , কেন পাহারা ! কিসের পাহারা ? কে করবে আক্রমণ! কেনই বা করবে ! এটা তো ভারতবর্ষ ।দেশটা যে স্বাধীন , সার্বভৌম , সমাজ তান্ত্রিক , ধর্ম নিরপেক্ষ ,গণতান্ত্রিক , প্রজাতন্ত্র ! ওরা যে ভারত বাসী ! মানে সার্বভৌমিক , স্বধর্মাচারী , পরধর্ম সহিষ্ণু এক উদার মানব সমাজ । তাহলে কিসের ভয় ! দাদাদের পাহারাতেই বা ভরসা কিসের ! আসলে এটাই এখন দেশের জুজু ! এই জুজুতেই ব্যালট বাক্সে বাজিমাৎ  করতে সবাই মরিয়া !

 আট

আপনার সামনে দিগন্ত এখন উন্মুক্ত । দারিদ্র , ক্ষুধা , অনাহার , অশিক্ষা , কুসংস্কার , সংখ্যালঘু , অনগ্রসর – এই সমস্ত রিপুর অনুপ্রবেশ ঘটিয়ে আধুনিক কৌশল কিভাবে সংস্কৃত সভ্য শরীরের প্রতিটা পরমাণুতে পচন ধরিয়েছে , আপনি সেটা প্রত্যক্ষ করলেন । ল্যাপটপটা আগেই কোল থেকে নামিয়ে রেখেছেন । ওখানকার পালিশ করা হাজার হাজার তথ্যের সঙ্গে আপনার চোখের দেখার বিন্দুমাত্র সাদৃশ্য খুঁজে না পাওয়ায় আপনি ওটা ছুঁড়ে ফেলবেন জলে । চারপাশে ছড়িয়ে থাকা তথ্যগুলো (সত্য) পরম মমতায় একে একে তুলে নেবেন কোলে । আপনার আর শান্তিনিকেতন যাওয়ার প্রয়োজন হবে না । শিমুল তলার নরম মাটিতে সবুজ ঘাসের উপর বসে – প্রাণের উত্তাপ , হৃদয়ের মমতা আর চোখের জলে পরিশুদ্ধ করে সে গুলো সাজিয়ে তুলে দেবেন ভাবী কালের হাতে । এতে নোবেল হয়তো আপনার জুটবে না । কিন্তু নোবেল সভ্যতা সৃষ্টির যে পথ আপনি উন্মোচন করবেন , সেই প্রাপ্তির আনন্দ আপনার নোবেল প্রাপ্তির আনন্দকেও ছাপিয়ে যাবে ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

scroll to top