বিচ্ছেদ লিখেছেন চৈতালী চক্রবর্তী | ছোটগল্প | আমার সাহিত্য

বিচ্ছেদ

চৈতালী চক্রবর্তী


আজ আর কিছু ভালো লাগছে না রাহীর।
কি যে করবে। কোথায় যে যাবে। কাকে বোঝাবে সে এসব। কেই বা তার কথা শুনবে বুঝবে।

মাকে সে বরাবর ভয়ই পেয়েছে। কোনো কিছু বলতেও লজ্জা করেছে। বাড়ির পরিস্থিতি তাকে কোনোদিন সহজ হতে দেয়নি। ছোটবেলা থেকেই কাকা পিশি সবাই তাকে নিয়ে মজাই করেছে। কখনো কোনো কথা বিশ্বাস করে কাউকে বললে তারা তা নিয়ে হাসাহাসি করেছে। কেউ বুঝতে চায়নি তার
সাইকোলজি কি।

মনের মতো বন্ধু পেলেও রাহী কিন্তু সহজ হতে পারে নি তাদের কাছেও। চিরকাল রাহী বড্ড বেশি ইনট্রোভার্ট। আর কোথাও কোথাও সে এমন ধাক্কা খেয়েছে যে নিজেকে খোলবার আগেই গুটিয়ে গেছে। হয়তো এটাই বন্ধকতা ওর জীবনের। কাউকে সে মনের কথা কোনোদিন বলতে পারে নি। কাউকে ভালো লাগার কথাও বলতে শেখেনি সে।

এ হেন রাহী ভেতরে ভেতরে গুমরে এক ইনসিকিউরিটির শিকার হয়েই চলেছিলো।

একদিন তাদের বাড়িতে এলো কাকাই। যে বিদেশে থাকে। কাকাইকে দেখে রাহীর যেন মনে হলো এবার সে একটু নিঃশ্বাস নেবে। জীবনে কিছু কিছু লোককে যেন অজান্তেই ভীষণ ভরসা করতে ইচ্ছে করে। সেই যেন ছোট কাকাই।

রাহী মন থেকে কেমন চকচকে হয়ে ওঠে।
কাকাই এবার কাকিকে আর ভাইকে নিয়ে আসেনি। একাই এসেছে। কারণ জ্যেঠু অসুস্থ তার ট্রিটমেন্ট করাতে হবে। জ্যাঠতুতো দিদির পড়াশোনার খরচ কাকাই চালায়। জ্যেঠুর বড় অ্যাক্সিডেন্টে ব্রেনে চোট লাগে। তার অপারেশান কাকাই এসেই করায়। এ হেন সর্বংসহা মানুষকে শ্রদ্ধাই করতে ইচ্ছে হয় তার।

তারও বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে কাকাইয়ের সাথে। মাঝখানে একদিন ভীষণ শরীর খারাপ হয় জ্যেঠুর। তাকে একা ওঠাতে পারে না জ্যেঠি
ফলে কাকাইকে জ্যেঠি আর জ্যেঠুর পাশেই শুতে হয়।

রাহীর এই ব্যাপারটা একটুও ভালো লাগে না। কিন্তু কাকাইকে সে ভালোবাসে। সে জানে কাকাই এমন কিছু কাজ করবে না যে তাতে কারো ক্ষতি হতে পারে। না না এসব কি ভাবছে রাহী। কেনই বা ভাবছে। কাকাই সবাইকে ভালোবাসে। তবে কি সে ভালোবাসা শেয়ার হতে দিতে চায় না।

এভাবেই চলছিলো। কিন্তু একদিন রাতে রাহীর হঠাৎ ঘুম ভেঙ্গে যায়। সেই রাতের কথা রাহী কাউকে কোনোদিন বলতে পারে নি। সেদিন কাকাই বন্ধুদের সাথে পার্টি করে নেশা করে বাড়ি ফেরে।

জ্যেঠি আর কাকাইয়ের বয়সের খুব একটা তফাত নেই। সেদিনের পর থেকে রাহীর মন থেকে কাকাইয়ের প্রতি আর কোনো শ্রদ্ধা বাঁচেনি। রাহী সেদিন বুঝতে পারে জ্যেঠির সব ইচ্ছেপূরণের পেছনে কাকাইয়ের উৎসাহের কারণটা কি। কেন কাকিমণি কাকাইকে এতটা অপছন্দ করে। কেন কাকাই বার বার
এখানে চলে আসে। কেন কাকাই সবকিছু জ্যেঠির নামে করে দিতে চায়।
রাহী আগে ভাবতো হয়তো জ্যেঠু তেমন কামাতে পারে না তাই। কিংবা জ্যাঠতুতো দিদিকে ভালোবাসে তাই।

একটু বড় হয়ে সে বুঝেছে সবার মনের ভেতরে একটা চোরা কুঠুরি থাকে সেখানে নিজেকে নিয়ে মানুষ যথেচ্ছাচার করে। তারপর থেকে আর কোনোদিন রাহী নিজের বন্ধু বলে কাকাইকে আর শ্রদ্ধা করতে পারে নি। মা কতবার বলেছে কাকাই তোকে এতো ভালোবাসে আর তুই যেন কেমন। দিদিকে দেখ ও সবসময় কাকাইকে কতো ভালোবাসে কাকাই ও কত ভালোবাসে ওকে। আর তুই?

রাহী মাকে বোঝাতে পারে না যে সব ভালোবাসা একরকম হয় না মা। যাকে দেবতা ভেবে জায়গা দিয়েছিলাম সে আজ শয়তানের সাজে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আর কোনোদিন সে ভগবান হতে পারবে না মা।
দিদি যে ভালোবাসা কাকাইয়ের কাছ থেকে পেতে পারে আমি চাইলেও তা কোনোদিন পাব না বা ওভাবে পাওয়ার ইচ্ছে তোমার মেয়ের নেই।

দুনিয়ায় সব সম্পর্কের সমান মানে হয় না।
কোথাও কোথাও চাদরের আড়ালে মুখোস ঢাকা থাকে। তোমার মতো সুন্দর মনের মানুষেরা তা বুঝবে না কোনোদিন।

@কপিরাইট চৈতালী চক্রবর্তী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

scroll to top